ফেনীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকদের গাড়িতে হামলার ঘটনায় পরস্পরকে দায়ী করছে স্থানীয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের দাবি, পরিকল্পনা করে ঘটনাটি বিএনপিই ঘটিয়েছে। এক্ষেত্রে তারা আওয়ামী লীগে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ ব্যবহার করেছে। আর বিএনপি নেতারা বলছেন, হামলাকারীদের পরিচয় সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হয়ে গেছে। তারা সবাই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
এদিকে গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের ক্ষোভ পুলিশের ওপর। তাদের দাবি, সাংবাদিকদের গাড়িতে হামলার ঘটনার পর ৩৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শুরু করেনি পুলিশ। এ ব্যাপারে দ্রুত তদন্ত শুরু করার জন্য সরকারের নির্দেশনা থাকলেও পুলিশের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
ফেনী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার জানান, গাড়িবহর ও সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীরা এখনও প্রকাশ্য ঘুরছে বলে তথ্য আসছে। কিন্তু হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের কোনও তথ্য পুলিশ দিতে পারেনি। এমনকি তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও আমরা জানতে পারিনি।
এ বিষয়ে জানতে রবিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিন দিন অপেক্ষা করেন। সব অগ্রগতির তথ্য আপনাদের জানানো হবে।’
এদিকে, খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনার সময়ের কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের স্মার্টফোনে ধারণ করা ছবির সূত্র ধরে স্থানীয়রা বলছেন, সাংবাদিকদের গাড়িতে লাঠি নিয়ে হামলাকারীর নাম সবুজ ভূঞা। তিনি স্থানীয় শর্শদী ইউনিয়ন এক নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ওই গাড়িতে পাথর দিয়ে হামলা করা ব্যক্তি একই ইউনিয়নের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওসমান গনি রিয়েল। সাদা পাঞ্জাবি পরা আরেক হামলাকারী ফরহাদ, তিনি শর্শদীর জামায়েতুল মিল্লিয়া মাদ্রাসা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ফরহাদ আগে ছাত্রশিবির করতেন বলে জানান স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। এ ঘটনায় শর্শদী ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি নুর হোসেন, যুবলীগ সভাপতি ফারুক মজুমদারসহ ধর্মপুর ইউনিয়নের কয়েকজনের নামও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, শর্শদীর সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সাহাব উদ্দিন সিকদার এ হামলার পরিকল্পনা করেছেন। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হলেও আগে তিনি বিএনপি করতেন এবং এখনও বিএনপির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এই পরিকল্পনায় সাহাব উদ্দিনকে সহযোগিতা করেছেন ওই ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান জানে আলম ভূঞা ও ধর্মপুরের ইউপি চেয়ারম্যান সাহাদাত হোসেন সাকার। এই তিন জনের অনুসারী ছাত্রলীগ ও যুবলীগকর্মীদের নির্দেশে এ হামলা করা হয় বলে দাবি আওয়ামী লীগ নেতাদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হামলার খবরে স্থানীয় নেতাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন জেলার শীর্ষ নেতারা। এ ঘটনার পেছনে কয়েকমাস আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া সাহাব উদ্দিন সিকদারের হাত আছে বলে খবর পাওয়া গেছে। জাসদ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ঘুরে এখন আওয়ামী লীগে এসেছেন। তিনি বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন প্রকাশ ওরফে ভিপি জয়নালের আস্থাভাজন। বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়নে তিনি এ কাজ করেছেন। অতি উৎসাহী হয়ে স্থানীয় দুয়েকজন জনপ্রতিনিধি তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বলেই আমরা ধারণা করছি।’
তবে দুই ইউপি চেয়ারম্যান জানে আলম ভূঞা ও সাহাদাত হোসেন সাকা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। তারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শত্রুপক্ষ এ অপপ্রচার করছে। এটা বিএনপির দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে হয়েছে। এর সঙ্গে আমরা কোনোভাবেই জড়িত নেই। অভিযুক্ত সাহাব উদ্দিন সিকদারও এ ঘটনার সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে।
হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগকে দায়ী করে পৌর বিএনপির সভাপতি আলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ হামলার ছক তৈরি করেন শর্শদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সাহাব উদ্দিন সিকদারসহ দুই জনপ্রতিনিধি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। এত কিছু প্রকাশের পরও এ ঘটনার তদন্তই এখনও শুরু করেনি পুলিশ।’
বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ভিপি জয়নাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাহাব উদ্দিন সিকদার একসময় বিএনপির রাজনীতি করতেন। তবে সেটা অতীত। এখন তিনি সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগ করেন। তিনি যদি গাড়িবহরে হামলার ছকের সঙ্গে জড়িত থাকেন, সে দায়িত্ব তার দলকেই বহন করতে হবে।’
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ঘটনা জানার পরই জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যেই প্রমাণ হয়, এটা তাদেরই পরিকল্পিত হামলা। বহরে হামলার ঘটনায় একজন বিএনপি নেতাও আহত হননি। এটা আসলেই রহস্যজনক।’
ফেনী মডেল থানার ওসি রাশেদ খান চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার গাড়িবহর পুলিশ প্রটোকলে ফেনী সার্কিট হাউজে পৌঁছানোর পর হামলার খবর পেয়েছি। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। কিন্তু হামলার শিকার সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কোনও গাড়ি ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় জড়িতদের ব্যাপারে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরমর্শে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, গত শনিবার বিকাল পৌনে ৫টার দিকে ফেনীর ফতেহপুর রেলক্রসিং অতিক্রম করার পরপরই খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকদের গাড়িতে প্রথমে হামলায় ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় দফায় জেলা স্টার লাইন পেট্রল পাম্পের কাছ থেকে হামলা চালানো হয়।
এ সংক্রান্ত আরও খবর:
খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলায় যুবলীগ-ছাত্রলীগের জড়িত থাকার অভিযোগ
খালেদার গাড়িবহরে হামলা: ৩ গাড়িসহ টিভি ক্যামেরা ভাঙচুর, আহত ২








