সুন্দরবনের নদ-নদী খাল-জলাশয়ে অথৈ পানি। কিন্তু পান করার মতো সুপেয় পানি কই? চারপাশে নোনা পানির জলরাশি। এর মধ্যে আইলা, সিডরসহ ঘূর্ণিঝড়ে-জলোচ্ছ্বাসে লবণাক্ত পানি ওপরে উঠে আসায় মিঠা পানির আকাল পড়েছে এলাকায়। মিঠা পানির সন্ধান পেলে তাই প্রাণের প্রয়োজনে একই স্থান থেকেই পিপাসা মেটাচ্ছে বনজীবী থেকে শুরু করে সব ধরনের বন্যপ্রাণী।
কিছুটা অবাস্তব মনে হলেও পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকার জন্য ওপরের বাক্যগুলো শতভাগ সত্য। এমনকি পর্যটকরাও পুকুরের পানি করতে বাধ্য হন। বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায় এখানে। তৃষ্ণা মেটানোর বিকল্প কোনও উপায় না থাকায় বছরের পর বছর ধরে সবার জন্য নির্ভরতায় পরিণত হয়েছে বনের মধ্যে অবস্থিত মিঠা পানির একমাত্র দিঘিটি।
দিঘিটির নাম ‘বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তাফা কামাল দিঘি’।১৫০ ফুট লম্বা পুকুরটি প্রায় ১৫ ফুট গভীর ও ১০০ ফুট প্রস্থ। এ পুকুরটি শুধু যে লোকালয়ের লোকজন ও বনজীবীদের চাহিদা মেটাচ্ছে তা নয়, তৃষ্ণা মেটাচ্ছে বনের বাঘ ও হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর। দিনে অনেক দূর থেকে মানুষ এসে এ দিঘির পানি নিয়ে যায় আর রাতে মুখ ডুবিয়ে পানি খায় বাঘ থেকে শুরু করে অন্যান্য বন্যপ্রাণী।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পর্যটক, জেলে, বাওয়ালি ও বন্যপ্রাণীদের পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে সুন্দরবনের হারবাড়িয়ায় ১৯৯৭-৯৮ সালে বন বিভাগের উদ্যোগে খনন করা হয়েছিল এ দিঘি। চারপাশে লবণাক্ত পানি থাকা সত্ত্বেও দিঘিটিতে মিঠা পানির উপস্থিতিতে তখন চমক সৃষ্টি হয় সেখানে। এরপর থেকে মাইলের পর মাইল দূর থেকে এসে পুকুরের পানি সংগ্রহ করে নিয়ে যান স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানায়, জোয়ারের নোনা পানি বনের ভেতর ঢুকে পড়ায় সুপেয় পানির উৎস পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এখানকার হাজার হাজার মানুষের মধ্যে খাবার পানির জন্য হাহাকার চলছে। এ অবস্থায় খাবার পানি সংগ্রহের জন্য মংলাসহ বন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা নদী পথে মাইলের পর মাইল নৌকা চালিয়ে পুকুরটি থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করছে। এ জলাশয়টি অনেক দিন থেকেই এখানকার মানুষের প্রাণ রক্ষা করে চলেছে।
মংলার সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনিরঘোল, চিলা, বৈদ্ধমারী, কচুবুনিয়া, বরইতলা ও বাঁশতলার শত শত পরিবার চার মাস ধরে প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটারের নদী পথ পাড়ি দিয়ে গহীন বনের হাড়বাড়িয়ার পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করে দৈনন্দিন চাহিদা মিটিয়ে আসছে।
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মেহেদীজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুন্দরবনের ভেতরে এরকম সাতটি পুকুর আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে স্মরণ করে রাখতে এসব পুকুরের প্রত্যেকটির নাম রাখা হয়েছে একেকজন বীরশ্রেষ্ঠের নামে। হারবারিয়ার এ পুকুরটির নামকরণ করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামালের নামে।’
তিনি আরও জানান, বনের অন্য পুকুরগুলোর মধ্যে বর্তমানে শুধু এ পুকুরটিই ভালো অবস্থায় রয়েছে। ১৫০ ফুট লম্বা পুকুরটি প্রায় ১৫ ফুট গভীর ও ১০০ ফুট প্রস্থ। এ পুকুরটি শুধু যে লোকালয়ের লোকজন ও বনজীবীদের চাহিদা মেটাচ্ছে তা নয়, তৃষ্ণা মেটাচ্ছে বনের বাঘ ও হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর।
হাড়বাড়িয়া টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামসুল হক বলেন, ‘প্রতিদিন সুন্দরবনের বিভিন্ন স্টেশন থেকে বন বিভাগের কর্মচারীরা এবং লোকালয়ের হাজার হাজার জেলে-বাওয়ালি পরিবার থেকে শুরু করে পর্যটকরা পর্যন্ত পুকুরটি থেকে পানি নিয়ে চাহিদা মেটাচ্ছেন।’








