‘মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরার স্মৃতি এখনও তাড়া করে’

জহিরুল ইসলাম খান, মাদারীপুর
২০ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৩:২২আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৩:২৯

মুক্তিযোদ্ধা সুলতান বেপারী

‘আওয়ামী লীগ নেতা মান্নান ভাইয়ের (মান্নান মোল্লা) বাড়ি থেকে মিলিটারিরা আমাকে ধরে। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় জাউল্গা ঘাটে। এখান থেকে নৌকায় করে মিঠাপুর বাজারে আনা হয়। তখন মিলিটারিদের সঙ্গে ছিল রাজাকাররা। রাজাকারদের পরামর্শে সেখান থেকে ভূঁইয়া বাড়ি, সিকদার বাড়ি, খলিফা বাড়ি ও বর্তমান স্কুল লাইব্রেরি হয়ে মূল ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা হয় মিলিটারিরা। এর মধ্যে ওই তিন বাড়ি ও স্কুল লাইব্রেরিতে মিলিটারিরা হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। অনেককে আটক করে। তো মিলিটারিদের মূল ক্যাম্পের দিকে নেওয়ার পথে আমি পালাই। মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরার সেই স্মৃতি এখনও আমাকে তাড়া করে।’

সম্প্রতি কথাগুলো বলেন বোয়ালিয়ার দুধখালী মিঠাপুরের মুক্তিযোদ্ধা সুলতান বেপারী। একাত্তরে মিলিটারিদের হাত থেকে পালিয়ে বেঁচে যাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে সংক্ষেপে সুলতান বেপারী উপরের কথাগুলো বলেন। তখন ওই গল্প বিস্তারিত শোনার জন্য তাকে ধরলে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমার বয়স ১৪-১৫ বছর। দেশে যুদ্ধ লেগেছে, সে কথা শুনেছি। রেডিওতে ‘চরমপত্র’ নামে অনুষ্ঠান শুনতাম। যুদ্ধের সব খবর ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানে প্রচার করা হতো। একদিন সন্ধ্যায় ‘চরমপত্র’ শোনার জন্য মাদারীপুর সদর উপজেলার দুধখালী ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের মান্নান মোল্লার বাড়িতে যাই। অনুষ্ঠান শোনার পর রাতে আমি ওখানেই থেকে যাই। দিনটা সম্ভবত্ব ৪ জ্যৈষ্ঠ ছিল। মান্নান ভাই আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। মিলিটারির ভয়ে তিনি বাড়িতে থাকতেন না। সে দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন। আমি ও মোতালেব মোল্লা ঘরের উপরের তলায় ঘুমাই। ভোর প্রায় ৪টার দিকে দরজায় প্রচণ্ড শব্দ হয়। আমরা ভয়ে আঁতকে উঠি। মুহূর্তের মধ্যেই মিলিটারি ঘরে প্রবেশ করে। এরপর আমাকে ও মোতালেব মোল্লাকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। একজন মিলিটারি আমাদের দুই জনকে হাত পেছনের দিকে নিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে।’

চোখে-মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠে সুলতান বেপারীর। তিনি বলে চলেন, ‘আমার কলিজা তখন দপ দপ করছিল। সারা শরীর কাঁপছিল। আমি এতই ভয় পেয়েছিলাম যে, মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। মান্নান ভাই মিলিটারি আসছে বুঝতে পেরে একটি চাদর গায়ে দিয়ে দোতলা থেকে লাফ দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মান্নান ভাই গাছের সঙ্গে আঘাত খেয়ে নিচে পড়েন। মিলিটারি চারদিক থেকে তার বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল। ভাই মাটিতে পড়ে জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড় দেন। মিলিটারি তাকে পেছন থেকে পর পর দুইটি গুলি করে। গুলি দুইটি তার পায়ে লাগে। তিনি দৌড়াতে না পেরে পুকুরে ঝাঁপ দেন। পুকুরের ওপাড়ে গিয়ে মাথাটা একটু পানির ওপরে রেখে যন্ত্রণায় কাতরাতে শুরু করেন। আমি সব কিছু দেখছি, তবে অনেক কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মুখোশধারী কয়েকজন (চার জনের বেশি) বাঙালিকে (পাকিস্তানি দোসর) দেখলাম। অন্ধকারে তাদের চেনা যাচ্ছিল না। মান্নান ভাইকে পুকুর থেকে তুলে তার বুকে দুইটি গুলি করে পাকিস্তানি হানাদাররা। গগণবিদারী চিৎকার দিয়ে ভাইয়ের কণ্ঠ চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়।’

চোখের কোণে জল চিক চিক করতে থাকে সুলতান বেপারীর। কিছুটা ধরা গলায় তিনি বলেন, ‘আমার মুখ দিয়ে কোনও কথা বের হলো না, চোখ দিয়ে অশ্রু পড়ছিল। মনে করেছিলাম, ভাইয়ের মতো আমাকেও গুলি করে মারবে। মোতালেব এই দৃশ্য দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মিলিটারি মোতালেবকে কয়েকটা লাথি দিয়ে ছেড়ে দেয়। চারদিক একটু ফর্সা (পরিষ্কার) হলে মুখোশধারী বাঙালিদের চিনতে পারলাম। তারা হলো সোবাহান ওরফে কুটি মিয়া চৌধুরী (চন্ডিবর্দী), লতিফ হাওলাদার (হাউসদী), আনিস হাওলাদার, মুজিবুর হাওলাদার (হাউসদি), রব খালাসি (দুধখালী)। কুটি মিয়া ও মুজিবুর হাওলাদার এখনও জীবিত। অন্য সবাই মারা গেছে। তো আমাকে নিয়ে জাউল্গা (জেলে) ঘাটে নিয়ে আসে মিলিটারিরা। পথে বোয়ালিয়ার ছত্তার ভাইকে আটক করে। জাউল্গা ঘাটে আসার পর দেখি কয়েকটি ছোট নৌকা। একটি নৌকার মাঝি ছিল রব খালাসী। আমি তাকে দেখে সাহস পেলাম। বুঝলাম, রব ভাইকে বলে ছাড়া পাবো। আমি তাকে করুণ কন্ঠে বললাম, ভাই, আপনি ওদের বলে আমাকে ছাড়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সে আমাকে বলল, তোকে কি ছাড়বে, শালা। তোকে গুলি করে মারবে। তার কথা শোনার পর আমার বেঁচে থাকার আশা মরে যায়।’

সুলতান বেপারী বলেন, ‘হাত বাঁধা অবস্থায় আমাকে নৌকায় করে মিঠাপুর বাজারে নেওয়া হয়। মিলিটারিরা খালেরপাড় দিয়ে বাজারে যায়। বাজার থেকে মিলিটারিরা শিকদার বাড়ি যায়। রাজাকাররা পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। আমাকে ও ছত্তার ভাইকে ৭-৮ জন মিলিটারি ভূঁইয়া বাড়ি (হিন্দু বাড়ি) নিয়ে যায়। বর্তমানে এই ভূঁইয়া বাড়িতে বাস করেন ইসলাম জমাদ্দার। মিলিটারি আসছে, টের পেয়ে ওই বাড়ির লোকজন পালাতে থাকে। কিন্তু সবাই পালাতে পারেনি। ওই বাড়ির নারায়ণ সাহা ও তার ভাই পরেশ সাহাকে আমার সামনে মিলিটারিরা গুলি করে মারে। নারীদের ওপর চলে নির্যাতন। আমি সব কিছু চোখে দেখেছি, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। শেষে বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। একজন পাকিস্তানি সেনা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, হিন্দু বাড়ি কিদার হ্যায়। আমি কিছুই বলিনি। মিলিটারিরা হিন্দু পেলে গুলি করতো, মুসলমান পেলে আটক করতো। সেখান থেকে সিকদার বাড়ি ফেরার পথে মিঠাপুরের খলিফা বাড়ির খালেক খলিফাসহ ৬-৭ জনকে আটক করে। সিকদার বাড়িতে অসংখ্য লোককে হত্যা করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান স্কুল লাইব্রেরির সামনে আমাদের সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়। একজন অফিসার আমার সামনে চেয়ার পেতে বসে। অন্য একজন মিলিটারি একটি শালকাঠের লাঠি দিয়ে পিটানো শুরু করে। মারধরের কারণে অনেকে প্রসাব-পায়খানা করে দেয়। আমি ছোট বলে আমাকে মারধর করেনি। মারধর শেষ হলে একজন মিলিটারি একটি রুমের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। রুমটি ছিল তালাবদ্ধ। ওই মিলিটারি রুম থেকে শব্দ শুনতে পায়। তালাবদ্ধ রুমটির দরজা ভেঙে ফেলে। মিলিটারি দেখতে পায়, ৮-৯ জন হিন্দু ওই রুমে লুকিয়ে রয়েছেন। শেষমেশ তাদের মেরে ফেলা হয়। অফিসারের আদেশে ওই রুমের ভেতর ব্রাশ-ফায়ার করা হয়। রুমটি রক্তে লাল হয়ে যায়। আমার হৃদ-স্পন্দন তখন বন্ধ হয়ে যায়। সিকদার বাড়ির চারপাশে মিলিটারিদের হাতে শতাধিক লোক প্রাণ হারায়। হিন্দু এলাকার বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। সকাল ৯টার দিকে মিলিটারিদের ধ্বংসলীলা থামে।’

তিনি বলেন, ‘এরপর আমাদের নিয়ে মিলিটারিদের মূল ক্যাম্প মাদারীপুর এ.আর. হাওলাদার জুট মিলের দিকে রওনা দেওয়া হয়। বর্তমান সদর উপজেলার কালিবাজার থেকে হাউসদী পর্যন্ত যে খাল প্রবাহিত হয়েছে সেই খালের পাশ দিয়ে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে মিলিটারিরা। আমরা পেছনে, আর মিলিটারিরা সারি বেঁধে সবার সামনে চলছে। একজন মিলিটারি আমাদের দড়ির সঙ্গে বেঁধে গরুর মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। যারা মারধর খেয়েছে, তারা হাঁটতে পারছিল না। তবু বন্দুক দিয়ে আঘাত করে তাদের হাঁটতে বাধ্য করা হয়। আমি সবার পিছনে ছিলাম। আমি চিন্তা করলাম, যেভাবেই হোক, আমাকে পালাতে হবে। হাতের বাঁধন খোলার চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পর হাতের বাঁধন খুললামও। সুযোগ বুঝে দিলেম দৌড়। পিছনে কি ঘটছে, কিছুই দেখিনি। এক দৌড়ে আমি পথের আইলে আসি। পথের এই আইল বর্তমান চরমুগরিয়া-শ্রীনদী প্রধান পাকা সড়ক। মিলিটারি টের পেলে বাঁশি বাজায়, কিন্তু গুলি ছুড়েনি। সেদিন কিভাবে যে বেঁচে গিয়েছি, বলতে পারব না।’

সুলতান বেপারী বলেন, ‘এর কিছুদিন পর যুদ্ধে যাই। যুদ্ধের সময়ে প্রতিটি দিন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এক একটা দিনের ঘটনা এক একটা ইতিহাস। যুদ্ধের সময়ের ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে। সেই কথা মনে হলে আবেগে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। যুদ্ধের ৯টি মাস কষ্টে কাটিয়েছি। ভারতের বীরভূমে যুদ্ধের জন্য একমাস প্রশিক্ষণ নিয়েছি। সেখান থেকে আমাকে ও এলাকার তৈয়ব ভাইকে সেনাবাহিনীর সৈনিক বানানো হয়। যুদ্ধ করার জন্য আমাদের যশোর পাঠানো হয়। শত কষ্টে ৫ ডিসেম্বর যশোর শত্রু মুক্ত করি। জয় হওয়ার একমাস পর বাড়ি আসি। সেখানে সেনাবাহিনীর চাকরি করেছি।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু দেশে এসে শাসনভার গ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলাকে সোনার বাংলা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু দেশের শত্রুরা ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকেসহ তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করে। এখনও শত্রুরা দেশকে ধ্বংস করার নানা ষড়যন্ত্র করছে।’ বর্তমান সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করতে সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছি। আর মেধা ও কাজ দিয়ে নতুন প্রজন্ম সোনার বাংলা গড়বে।’

 

/এমএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম