স্বপ্নের উড়াল সেতু পেয়ে উচ্ছ্বসিত ফেনীর মানুষ। বৃহস্পতিবার (৪ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের প্রথম ছয় লেনের ফ্লাইওভারটি উদ্বোধন করেন। এরপরই উড়াল সেতুটি খুলে দেওয়া হয়। পরে দিনভর ফ্লাইওভারটি দেখতে ভিড় জমান স্থানীয়রা। ফেনীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও আসেন মানুষজন। সেতুটি যেন পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়। নান্দনিক ডিজাইনের উড়াল সেতুটি ঘিরে তাদের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো।
ঢাকা -চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর মহিপালে দেশের প্রথম ছয় লেনের ফ্লাইওভারটি নির্ধারিত সময়ের ছয় মাস আগেই বৃহস্পতিবার খুলে দেওয়া হয়। সকাল থেকেই ফ্লাইওভারটি দেখতে সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করেন স্থানীয়রা। দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর যান চলাচলের জন্য ফ্লাইওভারটি খুলে দেওয়া হয়। ছয়টি লেনে সারি সারি দূরপাল্লার যানবাহন চলতে শুরু করে। অনেকেই সেতুটি দেখতে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার নিয়ে এটি পাড়ি দেন। অনেককে সেতুর ওপরে সেলফি তুলতে দেখা গেছে।
প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দাগনভূঞা উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন বলেন, ‘দেশের প্রথম ছয় লেনের উড়ালসেতু হিসেবে এটি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়নের অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই মাইলফলকের সাক্ষী হতে পেরে ফেনীবাসী গর্বিত।’
মহিপাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শহিদুল উল্যাহ শহীদ বলেন, ‘যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনের অতিরিক্ত চাপে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ফেনীর মহিপালের নিত্যসঙ্গী ছিল যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাধারণ মানুষকে যানজটে পড়ে দুর্ভোগ পোহাতে হতো। প্রধানমন্ত্রী ও যোগাযোগ মন্ত্রী ফেনীবাসীর এই দুঃখ লাঘব করেছেন। এজন্য তাদের অভিনন্দন।’
পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন বুলবুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহিপালের দীর্ঘদিনের যানজট থেকে রেহাই পেয়ে বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে।’
পৌর প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজি বলেন, ‘উদ্বোধনের পরপরই মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছিল ফ্লাইওভারটি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স সেরে ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীও নেতাকর্মীদের নিয়ে উড়াল সেতু দেখতে আসেন।’
ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি জহিরুল হক মিলু বলেন, ‘মহিপাল উড়াল সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ায় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখতে পেয়েছি।’
দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ফ্লাইওভার ফলক উন্মোচন ও উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এ সময় গণভবনে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকসহ সরকারি কমকর্তারা।
অন্যদিকে, মহিপালে উড়ালসেতুর এক প্রান্তে ফেনীর চাড়িপুর কোব্বাদ আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে স্থাপিত ফলকটি উন্মোচন করেন জেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা।
অন্য প্রান্তে ফেনী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত স্থানীয় সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল মান্নান ও জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায়সহ সুধী সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
ফ্লাইওভারটি উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মানুষের যাত্রা সহজ করতে সরকার নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ফেনীর মহিপালের এই ফ্লাইওভারটি এর একটি। মহিপালে যানজট ছিল বড় সমস্যা। ক্রসিংয়ে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে এই ফ্লাইওভার করা হয়েছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন ফ্লাইওভারটি চালু হওয়ায় ফেনীর সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি বাণিজ্যও বাড়বে। সময় কমবে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতে।
এই উড়ালসেতু চালু হওয়ায় যানজটের অসহনীয় ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে। সাশ্রয় হবে অর্থ, সময় ও কর্মঘণ্টার। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সূচিত হবে সম্ভাবনার নতুন দ্বার।
উদ্বোধন শেষে ফেনী সদর আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী ভিডিও কনফারেন্সে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘সবাই জানত ফেনী খালেদা জিয়ার এলাকা। কিন্তু ফেনীর উন্নয়নে তিনি কোনও ভূমিকা রাখেননি। আপনি ফেনীতে বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছেন, ছয় লেনের ফ্লাইওভার করেছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল করেছেন।’
ফ্লাইওভার নির্মাণকারী সংস্থা আবদুল মোনেম লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক রবীন্দ্র কুমার দাস বলেন, ‘সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিভাগের তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ফ্লাইওভারের মূল দৈর্ঘ্য ৬৬০ মিটার, প্রস্থ ২৪ দশমিক ৬২ মিটার, সার্ভিস রোডের দৈর্ঘ্য এক হাজার ৩৭০ মিটার, সার্ভিস রোডের প্রস্থ ৭ দশমিক ৫ মিটার, সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য এক হাজার ১৬০ মিটার। সেতুতে স্প্যান ১১টি, পিসি গার্ডার ১৩২টি। ফুটপাথের দৈর্ঘ্য দুই হাজার ২১০ মিটার।’ তিনি জানান, ফ্লাইওভারটি ছয় লেনের হলেও সেতুর নিচের দুই পাশে আরও চারটি সার্ভিস লেন চালু থাকবে। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৮১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ছয় মাস আগেই তা শেষ হয়।
ফেনীর মহিপাল বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সঙ্গে সড়কপথে ঢাকাসহ সারাদেশের যোগাযোগের কেন্দ্রস্থল। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ফেনী-লক্ষীপুর জাতীয় মহাসড়ক এবং ফেনীর মূল শহরে প্রবেশের সংযোগস্থল হওয়ায় মহিপাল এলাকায় যানবাহনের চাপে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হতো। এছাড়া, দেশের আমদানি ও রফতানির অধিকাংশ পণ্য চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল হয়ে পরিবহন করায় যানজটের কবলে পড়ে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হতো। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারাদেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ও পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল করতে এ উড়ালসেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।








