উপুর করে একটা বাঘাইড় মাছ রাখা। এর ওজন ১০০ কেজি। মাছটিকে ৫-৬ জন ব্যক্তি নাড়াচাড়া করছেন। তাদের ঘিরে উপচেপড়া ভিড়। একদল যাচ্ছেন তো আরেকদল মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
তবে মাছটির দরদাম করার সাহস দেখাচ্ছেন না কৌতূহলীদের কেউ। কারণ, দাম হাঁকা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এককভাবে কেউ কিনতে না পারায় প্রতিকেজি মাছের দাম হাঁকা হয় ১ হাজার ২৫০ টাকা।
বুধবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের ইছামতির নদীর তীরে পোড়াদহ এলাকায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী ‘পোড়াদহ’ মেলা। মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল এই ১শ’ কেজি ওজনের বাঘাইড় মাছ।
পোড়াদহ মেলায় ১শ’ কেজি ওজনের এই বাঘাইড় মাছ এনেছেন গাবতলীর মাছ ব্যবসায়ী ভোলা, কাশেম, লাল মিয়া, নান্নু, জলিল ও মোস্তা। এটি ছাড়াও তারা ৮০ কেজি ওজনের আরও একটি বাঘাইড় মাছ, ১৭ কেজি ওজনের একটি বোয়াল মাছ, ১৫-১৮ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ, ৮-১০ কেজি ওজনের আরও একটি কাতলা মাছ, ১০-১২ কেজির একটি আইড় মাছ এনেছেন। এর মধ্যে ৮০ কেজি ওজনের বাঘাইড় মাছটি প্রতি কেজি একহাজার ২০০ টাকা, ১৭ কেজি ওজনের বোয়াল মাছ প্রতি কেজি একহাজার ৬০০ টাকা, ১৫-১৮ কেজি ওজনের কাতলা কেজিতে ২ হাজার ২০০ টাকা, ৮-১০ কেজি ওজনের কাতলা প্রতি কেজি একহাজার ২০০ টাকা, ১০-১২ কেজির আইড় মাছ কেজিতে একহাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা দরে বিক্রি করেন ওই ছয় মাছ ব্যবসায়ী।
মেলায় ১০ কেজি ওজনের মাছ আকৃতির মিষ্টি তৈরি করেছেন ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ। মহিষাবান এলাকার ব্যবসায়ী লতিফ এ মিষ্টির দাম হাঁকেন ৪ হাজার টাকা। এছাড়া এক কেজি, দুই কেজি, ৩ কেজি, ৪ কেজি ওজনের মিষ্টিও মেলায় পাওয়া গেছে ভিন্ন ভিন্ন নামে। এ দোকানে অন্তত ২০০ মণ মিষ্টি বিক্রি হয়েছে।
মেলায় মাছ ও মিষ্টি ছাড়াও ফানির্চার, বড়ই, পান-সুপারি, তৈজসপত্র, খেলনা ছিল। এছাড়া শিশুদের জন্য নাগরদোলা, চরকি, সার্কাসসহ অন্যান্য খেলার আয়োজন ছিল। আগামীকাল বৃহস্পতিবার এখানে শুধু নারীদের জন্য বড় মেলা অনুষ্ঠিত হবে।
বগুড়া শহরের ফুলবাড়ী এলাকার ব্যবসায়ী ও তরুণ রাজনীতিক রাশেদুল আলম শাওন জানান, তিনি সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে ৮ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ প্রতি কেজি ১২শ’ টাকা দরে কিনেছেন। স্থানীয় সমাজসেবক লুৎফর রহমান সরকার স্বপন জানান, হাজারো মানুষের পদচারণার মুখর ছিল মেলা প্রাঙ্গণ।
গাবতলী মডেল থানার ওসি খায়রুল বাসার জানান, পোড়াদহ মেলা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তৎপর ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কোনও প্রকার জুয়া বা অশ্লীল নাচ-গানের আয়োজন করতে দেওয়া হয়নি। দিনব্যাপী মেলায় কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এলাকার মুরুব্বি খাজা উদ্দিন, মহররম আলী, আব্বাস খলিফা, সুজা উদ্দিন জানান, প্রায় ২০০ বছর আগে হিন্দু সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে গাবতলী উপজেলার গোলাবাড়ি বন্দরের পোড়াদহ এলাকায় নদীর পাশে একদিনের পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় মন্ডল পরিবার বংশানুক্রমে মেলা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। এসময় শত বিঘা জমির ২২ জন মালিক চাষাবাদ বন্ধ রাখেন। গত বছর মহিষাবান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তাদের টোল আদায়ের দায়িত্ব দেননি। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবার তারা ওই জমিতে ধান চাষ করেছেন। ফলে এবার পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্বল্প পরিসরে মেলার আয়োজন করা হয়।
তারা আরও জানান, প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বুধবার আয়োজিত এই মেলা কালের বিবর্তনে হয়ে উঠেছে পূর্ব বগুড়াবাসীর মিলনমেলা। পোড়াদহ নামক স্থানে হয় বলে এ মেলার নাম হয়ে যায় পোড়াদহ মেলা। মেলাকে ঘিরে আশপাশে প্রায় ২০ গ্রামের মানুষ নিজ নিজ মেয়ে ও মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে এনে আপ্যায়ন করান। এ কারণে স্থানীয়রা আবার এ মেলাকে জামাই মেলা বলেন।








