সিলেটের জৈন্তাপুরে ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘর্ষে মুজ্জাম্মিল হোসেন নামে এক মাদ্রাসাছাত্র নিহত হয়েছে। এঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সোমবার রাতে জৈন্তাপুরের আমবাড়ী গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার, পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামানসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলামকে (সার্বিক) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার জানান, ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষে বিভিন্ন বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। আর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জানান, ওয়াজ মাহফিল নিয়ে স্থানীয় কওমি মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন ধরে মত-পার্থক্য চলে আসছে। এই বিরোধের জেরেই হামলা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জৈন্তাপুরের স্থানীয় আমবাড়ী জামে মসজিদে সোমবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। ওয়াজ চলাকালে রাত ১০টার দিকে প্রধান অতিথির বক্তব্য চলাকালে হরিপুর মাদ্রাসার মুহাদ্দিস আব্দুস ছালামের সঙ্গে আয়োজকদের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে হরিপুর মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা ওয়াজ বন্ধের চেষ্টা চালালে উভয় পক্ষ সংঘর্ষ জড়িয়ে পড়ে। এসময় ঘটনাস্থলে আহত হন মাদ্রাসার ছাত্র মুজ্জাম্মিল হোসেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই সে মারা যায়।
এদিকে হরিপুর এলাকায় বিভিন্ন মসজিদে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ওয়াজ মাহফিলে মাদ্রাসার শিক্ষকসহ ছাত্র নিহত হওয়ার সংবাদ প্রচার করা হয় এবং সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়। খবর পেয়ে উপজেলার বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসাসহ মুসল্লিরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আমবাড়ী এলাকায় হামলা চালায়। এসময় অর্ধশতাধিক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া ওই দিন রাত তিনটার দিকে জৈন্তাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কেন্দ্রি গ্রামের বাসিন্দা এখলাছুর রহমানের বাড়িত অগ্নিসংযোগ করা হয়।
পুলিশ সুপার মাহবুবুল আলম একজন মাদ্রাসা ছাত্রের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার জানান, এই হামলার ঘটনা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে। আর এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জৈন্তাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এখলাছুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে এ ধরনের ওয়াজ মাহফিল নিয়ে স্থানীয় কওমি মাদ্রাসার মধ্যে বিভিন্ন মত-পার্থক্য চলে আসছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে একাধিকবার বৈঠক হলেও নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি। সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি সিলেট জেলা প্রশাসককে জানানো হয়। এরই জের ধরে ওয়াজ মাহফিলে হামলার ঘটনা ঘটে।’
জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌরীন করিম বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমবাড়ী গ্রামে তাৎক্ষণিকভাবে মেডিক্যাল টিম বসিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি হতাহতদের নগদ অর্থ সাহায্য দেওয়া হয় এবং তাদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করা হয়।’
এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিলেটের দরগাহ মাদ্রাসায় সংবাদ সম্মেলনে জামেয়া ইসলামিয়া মাদরাসাতুল উলূম দারুল হাদিস হরিপুর মাদ্রাসার শিক্ষা সচিব মাওলানা নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘আমবাড়ী গ্রামের জামেয়া মসজিদের ওয়াজ মাহফিলে পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এসময় হামলাকারীরা আমবাড়ী গ্রামে শতাধিক নিরীহ মানুষের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে। এরপরও তারা আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘হরিপুর মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুস সালাম মাহফিলের দাওয়াত পাওয়ার পর মাহফিলে বয়ান করার জন্য আমবাড়ী গ্রামে যান। মাহফিলে মাওলানা গাজী সুলায়মান কোরানবিরোধী বক্তব্য দেওয়ায় এর প্রতিবাদ জানান তিনি। প্রতিবাদ জানানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কয়েকশ’ সন্ত্রাসী মাওলানা আব্দুস সালামের ওপর হামলা চালায়। এসময় তাকে রক্ষার জন্য মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। হামলায় মাদ্রাসার ১৩ জন শিক্ষার্থী আহত হয়ে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, গুরুতর আহতাবস্থায় হরিপুর মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুস সালামকে উদ্ধার করে আমবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা নাসির উদ্দিন তার বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার পর সন্ত্রাসীরা তার বাড়িতেও হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে।








