নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে গত মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) নগরীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সম্মেলনের আয়োজন করে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগ। ওই সম্মেলন থেকেই কমিটি ঘোষণা করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কমিটি ঘোষণা করা যায়নি। উল্টো ছাত্রলীগের এক পক্ষের ককটেল বিস্ফোরণ ও হাতাহাতিতে সম্মেলন পণ্ড হয়ে যায়। ছাত্রলীগের এই অংশের নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে সম্মেলন বানচাল করতে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পছন্দের প্রার্থীকে নেতৃত্বে আনতে তারা এ ঘটনাটি ঘটিয়েছেন বলে দাবি করেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
উত্তর জেলা ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের একটি অংশ শুরু থেকে চট্টগ্রামে সম্মেলনের মাধ্যমে উত্তর জেলা ছাত্রলীগের কমিটি হোক সেটি চায়নি। তাদের অনুসারীরাই পরিকল্পিতভাবে সম্মেলনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে উত্তর জেলা ছাত্রলীগে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের প্রভাব রয়েছে। চট্টগ্রামে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি দেওয়া হলে এবারও তার পছন্দের ছাত্রলীগ নেতারা নেতৃত্বে আসতেন। কিন্তু উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনসহ উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ তাদের পছন্দের ছাত্রলীগ নেতাদের নেতৃত্বে আনতে চেয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগের এই পক্ষের নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে সম্মেলনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, যাতে সম্মেলন না করে কেন্দ্র থেকে কমিটি দেওয়া হলে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে নেতৃত্বে আনা যায়।
সূত্র জানায়, তালুকদার পারভেজ আনসারি নামের একজনকে নেতৃত্বে আনতেই এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে তার পক্ষের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তাদের নগরীর এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের ওয়াসিম গ্রুপের নেতাকর্মীরা সহযোগিতা করেছে। ঘটনার দিন ওয়াসিমসহ তার অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থল থেকে সামান্য দূরে হোটেল অ্যাভিনিউয়ের সামনে অবস্থান করতে দেখা গেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বখতিয়ার সাইদ ইরান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্মেলন পণ্ড করার পেছনে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে আমরা তাদের শনাক্ত করতে পেরেছি। ঘটনার সময় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ দেখে ৬/৭ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। অধিক তদন্ত করে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেন ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে ছাত্রলীগের এই নেতা বলেন, ‘সম্মেলনে ভোটে তাদের প্রার্থী জয়ী হতে পারবে না এমন চিন্তা থেকে তারা সম্মেলন স্থগিত করতে ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তাদের সঙ্গে নগর ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীও ছিল।’
ঘটনার সময় ভিডিও ফুটেজ দেখে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তারা হলেন, যুবলীগ কর্মী রাসেল, ফরিদ ও জিহান। তাদের সঙ্গে হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে নগরীর এমইএস কলেজের কয়েকজন নেতাকর্মীকে। রাজনীতিতে রাসেল হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মনজুর আলমের অনুসারী। জানা যায়, সন্দ্বীপের মফিজুল ইসলাম জিকু সাধারণ সম্পাদক হয়ে যাচ্ছেন এমন সংবাদ থেকে তারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তাদের পরিকল্পনা ছিল হামলা চালিয়ে সম্মেলন বন্ধ করতে পারলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন সাধারণ সম্পাদক পদে তালুকদার পারভেজ আনসারিকে আনতে পারবেন। এক্ষেত্রে হামলাকারীরা সফলও হয়েছেন। সম্মেলন পণ্ড হওয়ার পর ওইদিন চট্টগ্রাম থেকে আংশিক কমিটি গঠন করার জন্য ৮ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। ওই তালিকায় তাদের পছন্দের প্রার্থী তালুকদার পারভেজ আনসারিও রয়েছেন বলে জানা গেছে। এই আট জনের তালিকা থেকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হবে।
উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বখতিয়ার সাইদ ইরান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্মেলন বাতিল করার পর ওইদিন রাতে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দসহ আমরা বসে ৮ জনের একটা তালিকা তৈরি করেছি। ওই তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে যাছাই-বাছাই করে দুজনকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত করা হবে।’
মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে সম্মেলনের প্রথম পর্বে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা সাবিক হোসেন সুইন বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এসময় মঞ্চের বাম পাশে হঠাৎ একটি বিকট শব্দ হয়। এ নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিশৃংখলায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পক্ষ হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এসময় হুড়োহুড়ি করে মিলনায়তন থেকে বের হতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী আহত হন। ছাত্রলীগের দুই পক্ষের হাতাহাতির সময় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মঞ্চে ছিলেন। তিনি বিশৃঙ্খলা থামানোর জন্যে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বারবার নির্দেশ দেন। তার সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতারা শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শান্ত না হওয়ায় দুপুর ১টার দিকে সম্মেলন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে ছাত্রলীগ নেতারা অতিথিদের নিয়ে সম্মেলন স্থল ত্যাগ করেন।








