ফাল্গুন মাস শেষের দিকে, শীতের শুষ্কতা শেষে এবার রৌদ্রজ্জ্বল শুকনো মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ঝালকাঠিতে সেচ সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। অপরিকল্পিতভাবে খাল ভরাট ও পুরাতন খালগুলো নতুন করে খনন না করার কারণে সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না কৃষকরা। তাই ধান রোপনের আগে চারা সবুজ থাকলেও পানির অভাবে তা শুকিয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, গত ৯ বছরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সেচ কর্তৃপক্ষ ৯৭ কিলোমিটার খাল খননের জন্য প্রায় ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। কিছু প্রকল্পের চার ভাগের মাত্র এক ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অনেক প্রকল্পের কাজ না করেই সংশ্লিষ্ট বিভাগকে ম্যানেজ করে বিল তুলে নিচ্ছেন ঠিকদাররা।
কৃষকদের দাবি, খাল খননের নামে বরাদ্দকৃত এ টাকা কোথায় গেল তা খতিয়ে দেখা দরকার।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঝালকাঠি জেলার অধিকাংশ খাল ভরাট হওয়ার কারণে পানি কমে গেছে। তাই পানি না পাওয়ায় সেচের সংকট দেখা দিয়েছে। মেশিন দিয়েও পানি ওঠানো যাচ্ছে না। পার্শ্ববর্তী ডোবা-নালা থেকে হাতে সেচ দিয়ে জমিতে পানি দিচ্ছেন কৃষকরা। বিএডিসি’র আওতায় ১৬টি সেচ নালার কাজ সমাপ্ত হলেও এখন পর্যন্ত বিদ্যুতের অভাবে তা চালু করা যায়নি। এছাড়া কিছু পাম্প বসানোর পর তা অকেজো হয়ে পরে থাকায় সেচের অভাবে বোরো আবাদ করতে পারছেন না কৃষকরা।
এ প্রসঙ্গে নলছিটি উপজেলার ষাটপাকিয়া ইউনিয়নের কাঠিপাড়া গ্রামের কৃষক খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এই এলাকায় গত বছর এবং এ বছর মাটির নিচে পানির লাইন বসালেও বেশির ভাগ এলাকায় তা চালু করা হয়নি। সেচের এই মৌসুমে পানি না পেলে কৃষকরা এগুলো দিয়ে কী করবে।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকার আমাদের উপকারের জন্য বিভিন্ন সুবিধা দিলেও বিএডিসি’র কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে এর সুফল পাচ্ছে না কৃষকরা। এখন পর্যন্ত বিদ্যুতের লাইন না দেওয়ায় অনেক নালা চালু করা যাচ্ছে না। তাছাড়া যে নালার সহায্যে বিদ্যুতের মাধ্যমে পানি দিয়ে বোরো আবাদ করা হচ্ছে তাতে খরচ বেশি হচ্ছে।’
এসব ব্যাপারে ঝালকাঠি বিএডিসি সেচ বিভাগের কর্মকর্তাদের জানানো হলেও তারা কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলেও অভিযোগ কৃষকদের।
কৃষকরা জানান, তাদের এলাকার ছোট-বড় খালগুলো ভরাট করা হচ্ছে। অনেক খালের জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। এসব খাল ভরাট না করে নতুন করে খনন করা হলে বোরো আবাদের এই মৌসুমে সেচ সংকট হতো না। কিন্তু বিএডিসি’র মাধ্যমে প্রতি বছর খাল খননের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ এলেও কর্তৃপক্ষ কোনও কাজ করছেন না।
ঝালকাঠি বিএডিসি সেচ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিগত ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ৭২টি সেচ নালা নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চালু আছে ৫৬টি। বাকি ১৬টি নালা বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না। ৪৬ হাজার মিটার সেচ নালার মাধ্যমে ১ লাখ ২০ হজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া ৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ৯৭ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। এবছর জেলায় ৮ হাজার ৪৭৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঝালকাঠি বিএডিসি’র সহকারি প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ঝালকাঠির ভরাট খালগুলো সেচ কমিটির মাধ্যমে তালিকা করে খনন করা হবে। এছাড়া ২০টি স্কিমে বিদ্যুৎ সংযোগ হয়নি। পল্লী বিদ্যুতের মাধ্যমে সংযোগ পেলে সেগুলো চালু হলেও কৃষক সেচ সুবিধা পাবেন।’
ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক শেখ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এবার বোরো আবাদ বেশি হচ্ছে। কৃষকদের সেচ ও সুষম সার প্রয়োগের জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, প্রায় শতাধিক ভরাট খালের তালিকা প্রতি বছর বিএডিসি সেচ বিভাগে ও এলজিইডিতে প্রদান করা হয়। এগুলো সেচের আওতায় এনে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে।








