কোনও ধরনের নিয়মনীতি না মেনেই রাগীব আলীর বন্দোবস্ত নেওয়া সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানের ভেতরে টিলা কাটা হচ্ছে। চা-বাগানের 'উন্নয়নের' নামে তার নির্দেশেই এই টিলাগুলো কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চা বাগান দখল ও সরকারের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলায় গত বছর রাগীব আলী ও তার ছেলে আব্দুল হাই প্রায় ১১ মাস কারাভোগ করেন। এরপর ওই বছরের ২৯ অক্টোবর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। এরপর ফের টিলা কাটা শুরু করেন তিনি। একেকটি টিলার উচ্চতা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ফুট। কোনোটিতে আছে চা-বাগানের ছায়াগাছ। আবার কোনোটিতে রয়েছে চা গাছ।
অভিযোগ উঠেছে, চা বাগানের ভেতরের রাস্তা বড় করার নামে কাটা হচ্ছে সাতটি টিলা। সিলেটে রাগীব আলীর বন্দোবস্ত নেওয়া চা-বাগান মালনীছড়ার ভেতরে চলছে এ ধ্বংসযজ্ঞ।
শনিবার (১০ মার্চ) দুপুরে বাগানের ভেতরে টিলা কাটার ছবি তোলায় একটি দৈনিক পত্রিকার আলোকচিত্রী ও পরিবেশ আন্দোলনের তিনজন কর্মীকে প্রায় একঘণ্টা জিম্মি করে রাখে বাগান কর্তৃপক্ষ। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের মুক্ত করে নিয়ে আসে।
পুলিশ জানায়, মালনীছড়া চা বাগানের হিলুয়াছড়া রাস্তার পাশে একটি টিলা কাটা হচ্ছিল। ওই সময় বাঘের বিচরণ দেখতে বন বিভাগের ক্যামেরা ট্র্যাকিং এলাকা পরিদর্শন করছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিম, সিলেটের সাইক্লিং কমিউনিটির মডারেটর আখতারুজ্জামান, পরিবেশকর্মী নিয়ামুল ইসলাম খান ও প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক আনিস মাহমুদ। এ সময় আনিস মাহমুদ টিলা কাটার ছবি তুলতে গেলে তাকেসহ চারজনকে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শ্রীকান্ত দাশের নেতৃত্বে একদল পুলিশ, জেলা প্রশাসনের ভূমি শাখার এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি দল ও সাংবাদিকরা চা বাগানের ফটকে জড়ো হন। প্রায় একঘণ্টা পর পুলিশ ফটক খুলে ওই চারজনকে উদ্ধার করে।
বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম জানান, মালনীছড়া চা বাগানে চিতাবাঘের বিচরণ দেখতে গত ২ ফেব্রুয়ারি বন বিভাগের পক্ষ থেকে ক্যামেরা লাগানো হয়। সেটা দেখতেই তারা সেখানে যান। এ সময় মালনীছড়ার মধ্যবর্তী এলাকা হিলুয়াছড়া ও পাশের আরেকটি চা-বাগানে বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে শুনে তারা ওই দিকে যান।
আব্দুল করিম আরও বলেন, ‘ফেরার সময় মালনীছড়ায় টিলা কাটতে দেখি এবং কারণ জানার চেষ্টা করি। এভাবে টিলা কাটা আইনত নিষিদ্ধ বলেও তাদের জানানো হয়। তখন ‘বাগান ম্যানেজারের লোক’ পরিচয়ে কয়েক ব্যক্তি প্রধান ফটকে তালা দিয়ে আমাদের জিম্মি করে।’’
বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক শ্রীকান্ত দাশ বলেন, ‘ওই বাগানের মালিকের নির্দেশে কর্মচারীরা মূল ফটক আটকিয়ে তাদের জিম্মি করে রেখেছিল। পুলিশ সেখানে হাজির হওয়া মাত্র বাগানের লোকেরা চলে যায়। এ বিষয়ে বাগানের দুজন সহকারী ব্যবস্থাপককে ঘটনাস্থলে এনে লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জিম্মি ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, টিলা কাটা, জিম্মি করে রাখা ও পরে মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীসহ তিন পক্ষের বক্তব্য নিয়ে রেখেছে পুলিশ। এ ব্যাপারে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
সরেজমিনে মালনীছড়া চা-বাগান ও হিলুয়াছড়া এলাকায় গিয়ে তিনটি বড় বড় টিলা কাটা অবস্থায় দেখা গেছে। টিলার আশপাশের বাসিন্দা ও চা-পল্লীর লোকেরা জানিয়েছেন, রাস্তা বড় করার জন্য টিলা কাটা হচ্ছে।
এরমধ্যে হিলুয়াছড়া রাস্তায় ঢুকে তিনটি টিলা পাওয়া গেছে। এখানকার একটি টিলার এক-তৃতীয়াংশ কাটা হয়েছে। অন্য দুটো টিলার পাশের অংশ কেটে রাস্তা বড় করা হচ্ছে। এছাড়া বাগানের ভেতরকার রাবার বাগানের আরও চারটি টিলা কেটে সমান্তরাল করা হচ্ছে।
মালনীছড়া চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক আজম আলী বলেন, ‘মালিক পক্ষ (রাগীব আলী) সরকারের অনুমতি নিয়ে টিলা কাটার নির্দেশ দিয়েছেন।’ ফটোসাংবাদিকসহ পরিবেশকর্মীদের জিম্মি করে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি আসলে ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে। পরিচয় না জেনে তাদের আটকে দিয়েছিল এখানের লোকেরা। আমরা জানার পর তাদের মুক্ত করে দেই।’
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসনের ভূমিসংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের একটি দল। টিলা কাটতে এ ধরনের কোনও নির্দেশনা জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হয়নি বলে জানান তারা। সহকারী ভূমি উন্নয়ন কর্মকর্তা (খাসদবির) শামসুল আলম বলেন, ‘চা-বাগান বন্দোবস্তের নির্দেশনায় আছে— কোনও টিলা বা ভূমির আকার পরিবর্তন করা যাবে না। এ নির্দেশনা অমান্য করলে বন্দোবস্ত বাতিল করার বিধিও আছে। টিলা কাটার সত্যতা পাওয়ায় এ বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবিহত করবো।’
বিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরী জামানও। তিনি বলেন, ‘এভাবে টিলা কাটার কোনও আইনি ভিত্তি নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’








