স্বাভাবিক নিয়মে আবেদনের সাত দিনের মধ্যে বিদ্যুতের মিটার পাওয়ার কথা। কিন্তু কক্সবাজারের চকরিয়া এলাকার এক গ্রাহক এক বছর তিন মাস অপেক্ষার পরও মিটার পাননি। মিটারের সংযোগ চাইতে গিয়ে উল্টো বিভিন্ন সময়ে তাকে বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের কর্মকর্তাদের হাতে নাজেহাল হতে হয়েছে। বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মকর্তার দায়ের করা মামলায় বর্তমানে ওই গ্রাহক কারাগারে রয়েছেন।
বিদ্যুৎ মিটারের আবেদনকারী ওই গ্রাহকের নাম সৈয়দ আলম। তার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ডে। সৈয়দ আলমের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন,বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাদের খামখেয়ালি আচরণের প্রতিবাদ করায় মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
বুধবার (২৮ মার্চ) চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদে বিদ্যুৎ ভবনে বিদ্যুৎ-সেবার মান নিয়ে বিভাগীয় গণশুনানির আয়োজন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই শুনানিতে উঠে আসে এই গ্রাহকের ভোগান্তির কথা।
শুনানিতে সৈয়দ আলমের ছেলে মনছুর আলম অভিযোগ করেন, ‘বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার পরও তারা মিটার সংযোগ পাননি।’ বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন তাদের যে ভোগান্তি দিয়েছে, তা বর্ণনা করতে গিয়ে এ সময় কেঁদে ফেলেন মনছুর আলম । একপর্যায়ে স্টেজে উঠে গিয়ে দুদক কমিশনার নাসিরউদ্দীন আহমেদের পা ধরে এই ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে সহযোগিতা চান।
মনছুর আলম জানান, গত বছরের ৭ জানুয়ারি দুটি মিটার সংযোগের জন্য চকরিয়া বিদ্যুৎ কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার নামে ব্যাংকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা জমা দেন তার বাবা ছৈয়দ আলম। দুটো মিটারের মধ্যে একটি তাদের বাড়ির উঠানে টমটম গাড়ি চার্জ দেওয়ার জন্য। আর অন্যটি তার মায়ের পৈত্রিক সম্পত্তিতে নির্মিত মার্কেটের জন্য।’
তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মিটার সংযোগ দেওয়া হয়নি। কেন সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না, তা জানতে গত ৭ মার্চ বাবা স্থানীয় বিদ্যুৎ কার্যালয়ে যান। তখন তাকে অপমান করেন তিন কর্মকর্তা। এ ঘটনায় আমার বাবা গত ১১ মার্চ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চকরিয়া বিদ্যুৎ কার্যালয়ের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই কর্মকর্তারা পাল্টা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ মামলায় বাবা (ছৈয়দ আলম ) এখন কারাগারে রয়েছেন।’
মনছুর আলম অভিযোগ করেন, বুধবার দুদকের শুনানিতে অভিযোগ করার পর আজ বৃহস্পতিবার সকালে আমার দোকানে (বিসমিল্লাহ লাইব্রেরি) অপরিচিত লোক এসে দুদফায় হুমকি দিয়েছেন। প্রথম দফায় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দুই অপরিচিত লোক এসে বলেন, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করতেছিস না? তোকে দেখে নেবো। তোর দোকান অবৈধ, তোকে এখান থেকে তুলে দেবো।’ দ্বিতীয় দফায় অপরিচিত আরেকজন লোক এসে দেখে নেওয়ার জন্য দুই মাস সময় বেঁধে দিয়ে যান। দুই মাসের মধ্যে দোকান উচ্ছেদ করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।’ মনছুর আলম এই হয়রানি থেকে পরিবারকে রেহাই দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাদের কাছে অনুরোধ জানান।
মনছুর আলম আরও জানান, গতকাল (বুধবার) গণশুনানিতে অভিযোগ করায় এবং বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি হওয়া আজ (বৃহস্পতিবার) তার বাবাকে জামিন দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি এখনও কারাগারে আছেন।
সৈয়দ আলমের দায়ের করা মামলার এজাহারে দাবি করা হয়, গত বছরের ৭ জানুয়ারি দুটি মিটার সংযোগের জন্য চকরিয়া বিদ্যুৎ বিতরণ অফিসে গেলে প্রকৌশলী ফয়জুল আলীম আলো ও উপ সহকারী প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম তাকে মিটার রিডার দেবানন্দ দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তাদের কথা মতো দেবানন্দ দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দুটি মিটারের জন্য এক লাখ ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তার কথা মতো গত ৮ জানুয়ারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চকরিয়া ব্র্যাঞ্চের অ্যাকাউন্ট নম্বর ০০২০০১৫৯০০০৫০১ এর মাধ্যমে এক লাখ ৬০ হাজার টাকার চেক দেই। আমার অ্যাকাউন্ট থেকে ওই টাকা দেবানন্দ দত্ত ওইদিনই উত্তোলন করেন। ওই টাকা দেওয়ার এক মাসের মধ্যে তারা আমাকে মিটার সংযোগ দেবেন বলে আশ্বস্ত করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মিটার সংযোগ না দিলে, আমি বারবার তাদের অফিসে গিয়ে তাগাদা দিতে থাকি। তারা আমাকে আজ দেবো, কাল দেবো বলে সময় ক্ষেপণ করতে থাকে। দীর্ঘ এক বছর পরেও মিটার সংযোগ না পেয়ে গত ৭ মার্চ বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে সংযোগ না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাই। তখন ওই তিন কর্মকর্তা ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে অফিস থেকে বের করে দেন। তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানানোর পরও কোনও সুরাহা না হওয়ায় আমি মামলা করতে বাধ্য হয়েছি।
অভিযুক্ত প্রকৌশলী ফয়জুল আলিম আলো বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সৈয়দ আলমের সঙ্গে আমার কোনও চেক লেনদনের ঘটনা ঘটেনি। তিনি (সৈয়দ আলম) মিটার রিডার দেবানন্দ দত্তকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকার একটি চেক দিয়েছেন। বিষয়টি আমি মামলা দায়েরের পর জানতে পারি। পরে এ বিষয়ে দেবনন্দ দত্ত আমাকে জানিয়েছেন- ‘ব্যবসায়িক কাজে সৈয়দ আলম তার (দেবানন্দ দত্ত) কাছ থেকে এক লাখ ৪০ হাজার বা দেড় লাখ টাকা ধার নিয়েছেন। ওই টাকার সিকিউরিটি হিসেবে তিনি সৈয়দ আলমের কাজ থেকে সুদসহ এক লাখ ৬০ হাজার টাকার একটি চেক নেন।’
ফয়জুল আলিম আরও বলেন, ‘মামলা হওয়ার পর আমি দেবানন্দ দত্তকে চাকরি থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছি। পাশাপাশি দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছিলাম।’ সৈয়দ আলম দুটি মিটার নয় একটি মিটারের জন্য আবেদন করেছেন বলে তিনি জানান।
আবেদনের এক বছর পরও কেন মিটার দেওয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সৈয়দ আলম গত বছরের ৭ জানুয়ারি টমটম চার্জের জন্য একটি মিটারের আবেদন করেন। এরপর আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে ১৫ ফেব্রুয়ারি ওই মিটারের ডিমান্ড নোটের কপি জমা হয়। এরপর আমরা তিন দফায় মিটার সংযোগ দেওয়ার জন্য ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম, গ্রাহকের অনুরোধের কারণে ওই সময় মিটার সংযোগ দিতে পারিনি। প্রথম দুই বার যেখানে টমটমগুলো চার্জ দেওয়া হবে, ওই জায়গা প্রস্তুত না থাকায়, তারা পরে মিটার সংযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।’
ফয়জুল আলিমের ভাষ্য— ‘গত অক্টোবর মাসে তৃতীয় দফায় গেলে সৈয়দ আলম জানান, বাড়িতে টমটম চার্জের ব্যবস্থা করলে বাড়ির পরিবেশ নষ্ট হবে বলে তার ছেলে মিন্টু আপত্তি জানিয়েছে। এ সময় তিনি (সৈয়দ আলম) অন্য আরেক জায়গায় একটি গ্যাস পাম্পে মিটার সংযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন। তার চাহিদা মতো হালকাকারী এলাকায় নাজিম উদ্দিনের গ্যাস পাম্পে মিটার সংযোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সৈয়দ আলম আমাদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন। সর্বশেষ গত ১৪ মার্চ মিটার সংযোগ স্থাপনে সহযোগিতা করার জন্য একটি চিঠি নিয়ে তার কাছে গেলে, তিনি এলাকার আরও কয়েকজনকে নিয়ে আমাদের হামলা চালান। এ ঘটনায় আমরা বিদ্যুৎ আইনের ৪৪ ধারায় মামলা করেছি। ওই মামলায় গত ২৫ মার্চ আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘সৈয়দ আলম আমাদের নামে যে মামলা দিয়েছেন ওই মামলার দুই নম্বর আসামি উপ সহকারী প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম গত বছরের ১১ নভেম্বর চাকরিতে যোগদান করেন। অথচ ঘটনাটি আরও অনেক আগের।’








