হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে আলোচিত কিশোরী বিউটি ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ফেসবুক ছাড়াও সারাদেশে যখন তোলপাড়, তখন হবিগঞ্জের মানবাধিকার, নারী ও সামাজিক সংগঠনগুলো নীরব। হত্যাকাণ্ডের ১৪ দিন পার হলেও জেলার কোথাও কোনও প্রতিবাদ বা মানববন্ধনেরও খবর পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমেও কোন বিবৃতি দেয়নি কোনও সংগঠন। স্থানীয়রা বলছেন, ধর্ষকের পরিবার প্রভাবশালী। তার মা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। অন্যদিকে, বিউটির পরিবার দরিদ্র হওয়ায় তাদের পাশে কোনও সংগঠন দাঁড়াচ্ছে না।
আগে হবিগঞ্জের ৪ শিশু হত্যা ও শায়েস্তাগঞ্জে সুখিয়া রবি দাসের হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জেলাজুড়ে সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও ব্যতিক্রম দেখা গেছে বিউটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জের বিশিষ্ট লেখক ও নারীনেত্রী রুমা মোদক বলেন, ‘মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ নেই। শুধু বিউটি নয়, দেশে অনেক নারী হত্যার বিচার হয়নি। হবিগঞ্জে অনেক নারী সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন আছে কিন্তু কী কারণে তারা প্রতিবাদ করছে না, বুঝতে পারছি না।’ বিউটির পরিবার দরিদ্র বলেই এমনটি হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দিবসে আমরা নারীবাদী সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠনের ব্যানারে র্যালি-সমাবেশ দেখি; কিন্তু এখন তারা নিরব। বিউটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবাদ না করলে ভবিষ্যতে আমাদের আরও খারাপ কিছু দেখতে হবে। আমাদের সবার উচিত বিউটির পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।’
মানবাধিকার কমিশন শায়েস্তাগঞ্জ শাখার সভাপতি আব্দুর রকিব বলেন, ‘বিউটি হত্যাকাণ্ড একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। আমাদের মানবাধিকার সংগঠনের উদ্যোগে শিগগিরই ঘটনাস্থলে যাবো। আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের আইনি সহযোগিতা ভিকটিমের পরিবারকে দেওয়া হবে।’ তবে এতদিনেও কোনও প্রতিবাদ নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কিছুটা অসুস্থ। তবে এর প্রতিবাদ হওয়া জরুরি।’
বিশিষ্ট লেখক-সাহিত্যিক জেলা মানবাধিকারের সহ-সভাপতি তাহমিনা বেগম গিনি বলেন, ‘পুলিশের গাফলতির কারণে এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। এ নিয়ে সবাই মিলে সমন্বিতভাবে প্রতিবাদ করা উচিত। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভিকটিমের পরিবারের পাশে দাঁড়াবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে অহরহ নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। এর কোনোটারই বিচার হয়নি। নারী নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে বখাটেরা এ ধরনের কাজ করতে সাহস পেতো না।’ পরিবারটি দরিদ্র বলেই কেউ মেয়েটির এমন পরিণতির বিচারের দাবিতে মাঠে নামেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত ২১ জানুয়ারি একই গ্রামের দিনমজুরের মেয়ে বিউটি আক্তারকে বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় বাবুল মিয়াসহ তার লোকজন। এরপর তাকে বিভিন্ন স্থানে রেখে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে ধর্ষণ করে বাবুল। ঘটনার প্রায় এক মাস পর বাবুল কৌশলে বিউটিকে তার বাড়িতে রেখে পালিয়ে যায়। পরে ১ মার্চ বিউটির বাবা সায়েদ আলী বাদী হয়ে বাবুল ও তার মা ব্রাহ্মণডোরা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কলম চানের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলা করেন। আর নিরাপত্তা শঙ্কায় মেয়েকে পাঠিয়ে দেন তার নানার বাড়ি উপজেলার গুনিপুর গ্রামে। মামলায় ক্ষিপ্ত হয়ে বাবুল ১৬ মার্চ রাতে বিউটি আক্তারকে গুনিপুর থেকে ফের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে হত্যা করে লাশ হাওরে ফেলে দেয়। বিষয়টি প্রচার হলে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। বিষয়টি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়ে।
এদিকে, বিউটিকে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে পরদিন তার বাবা বাদী হয়ে বাবুল মিয়াসহ দুজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২১ মার্চ পুলিশ বাবুলের মা ইউপি সদস্য কলম চান ও সন্দেহভাজন হিসেবে একই গ্রামের ঈসমাইল নামের এক যুবককে আটক করে। কিন্তু মূল হোতা বাবুলকে এখনও আটক করতে পারেনি পুলিশ।








