কক্সবাজারের হোটেল মোটেল জোনে পর্যটন ব্যবসার আড়ালে সক্রিয় রয়েছে অপরাধী চক্র। ইয়াবার চালান মজুদ করে পরে ঢাকায় পাচার, যৌনকর্মীদের আনাগোনা ও দিনে দুপুরে জুয়ার আসর বসানো থেকে শুরু করে সেখানে বিভিন্ন অপরাধ হচ্ছে প্রকাশ্যে। টেকনাফ, উখিয়ার কয়েকজন ইয়াবা ‘গডফাদার’ও এ জোনে আস্তানা গেড়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এসব হোটেল মোটেল জোনের কিছু কিছু গেস্টহাউসে অভিযান পরিচালনা করলেও বেশিরভাগই রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কক্সবাজার শহরের কলাতলী ও সীমান্তের কয়েকটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এ অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণ করছে।
অভিযোগ উঠেছে, হোটেল মোটেল জোনে গড়ে ওঠা এসব গেস্টহাউসের বেশিরভাগ ভাড়ায় পরিচালিত হয়। অপরাধীরা মাসিক চুক্তিতে এককালীন ভাড়া নিয়ে সেখানে গড়ে তুলছে ইয়াবার মজুদ। পাওয়া যাচ্ছে যৌনকর্মীও। পর্যটন ব্যবসার আড়ালে নিরাপদে ইয়াবার মজুদ তৈরি করে পরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান করে দেওয়া হচ্ছে। মোটা অঙ্কের টাকায় আবাসিক গেস্টহাউস ভাড়া নিয়ে মাদকের এসব আখড়া তৈরি করা হয়। কয়েক দফায় ঢাকায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ কয়েকজন আটক হওয়ার পর বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া শুরু করেছে।
জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আফরুজুল হক টুটুল বলেন, ‘‘দফায় দফায় ঢাকায় ইয়াবাসহ আটকের ঘটনার পর বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে। ইয়াবার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কিছু আবাসিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের বিষয়টি পরিষ্কার। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। প্রতিদিনই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে হোটেল মোটেল জোনসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।’
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে কক্সবাজারের কলাতলী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বিপরীতে ‘সী-ফ্লাওয়ার’ নামের একটি কটেজ থেকে ১৪ জন যৌনকর্মীকে আটক করা হয়। কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেনের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। পরে তাদের জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযানে নেতৃত্বদানকারী নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, কলাতলী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সামনে বেশ কয়েকটি কটেজে অবৈধভাবে যৌন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কয়েকটি সিন্ডিকেট। কটেজের কয়েকটি কক্ষ ব্যবহার করে তারা এই ব্যবসা করে যাচ্ছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ‘সী-ফ্লাওয়ার’ এ অভিযান চালানো হয়। এতে কটেজের ভাড়াটিয়া দেলোয়ার পালিয়ে যায়। তাকে না পেয়ে কটেজটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।
গত ২৫ মার্চ হোটেল মোটেল জোন থেকে ১০ যৌনকর্মীকে আটক করে পুলিশ। রাত পৌনে ১১টার দিকে সদর থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে।
গত ১৫ মার্চ ঢাকায় লক্ষাধিক পিস ইয়াবাসহ চার জনকে আটক করে র্যাবের একটি দল। আটকদের মধ্যে কলাতলীর সুগন্ধার মোড় সংলগ্ন এলাকার শামীম গেস্টহাউসের ভাড়াটিয়া মালিক হোসেন আলীও রয়েছে। র্যাবের কাছে হোসেন আলী তার নাম গোপন রেখে মোহাম্মদ আলম হিসেবে পরিচয় দেয়। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী এলাকার হাজী সামশুল আলমের ছেলে হোসেন আলী এর আগেও একবার ইয়াবাসহ আটক হয়েছিল।
এর আগে ৪ মার্চ ঢাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অভিযানে ইয়াবাসহ আটক হয় বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদের মালিকাধীন কলাতলীর মেরিন প্লাজার ভাড়াটিয়া মালিক মাহমুদুল হক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্যমতে, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে রয়েছে মাহমুদুল হকের হোটেল। এর বাইরে আমদানি-রফতানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ফলে নিয়মিত ঢাকা-কক্সবাজার যাতায়াত ছিল। কক্সবাজারে সবাই তাকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে জানে। এই পরিচিতির আড়ালে সে ঢাকা-কক্সবাজারে গড়ে তুলেছে ইয়াবার নেটওয়ার্ক। তাকে রাজধানীর সেগুনবাগিচার নিউ ইয়র্ক হোটেলের একটি কক্ষ থেকে ৯ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক করা হয়।
সরকারি দায়িত্বশীল সংস্থার তথ্যমতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তালিকাভুক্ত টেকনাফের শীর্ষ ইয়াবা ‘গডফাদার’ সাইফুল করিমেরও আবাসিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে কলাতলীতে। আস্তানা গেড়েছে উখিয়ার শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী ফজল কাদেরও। আরও একাধিক চিহ্নিত গডফাদার এবং উঠতি গডফাদার আশ্রয় গড়ে তুলেছে কলাতলীতে। এসব আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পাইকারি ও খুচরা ইয়াবা বিক্রি হয়। এদের সঙ্গে কিছু ট্যু অপারেটর প্রতিষ্ঠানও যুক্ত রয়েছে। তবে একাধিক মোবাইল ফোন সিম ব্যবহার করায় কোনও ইয়াবা ব্যবসায়ীর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।








