কুড়িগ্রামে পাঁচ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা’র স্বীকৃতি চান পরিবারের সদস্যরা

আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
০৮ এপ্রিল ২০১৮, ১৫:৪৯আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৮, ১৫:৫৫


কুড়িগ্রাম কারাগার প্রঙ্গণে আয়োজিত পাঁচ শহীদের স্মরণ সভা

৭ এপ্রিল, ১৯৭১। সম্পূর্ণ বিনা বাধায় কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ওই দিনই তৎকালীন জেলা উপ-কারাগারে (বর্তমান সার্কিট হাউজ এলাকা) অতর্কিতভাবে হানা দেয় তারা। উপ-কারাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ পাঁচ জন কারারক্ষীকে ব্রাশ-ফায়ার করে হত্যা করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে কুড়িগ্রামের প্রথম শহীদ তারাই। স্বাধীনতা ঘোষণার পর বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন জন্যই তাদের হত্যা করা হয়েছে। 

বর্তমান জেলা কারাগারের প্রবেশপথের দক্ষিণে কারাপ্রাচীর সংলগ্ন আবাদি জমির মধ্যে সামান্য উঁচু একটি জায়গা রয়েছে। এটাই কুড়িগ্রামের প্রথম শহীদদের সমাধিস্থল। শহীদের নাম সম্বলিত একটা ফলকও রয়েছে এখানে।

কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও কুড়িগ্রামের মাটিতে প্রথম শহীদ হওয়া এই পাঁচ জনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। শনিবার ( ৭ এপ্রিল) কুড়িগ্রাম কারাগার প্রঙ্গণে আয়োজিত এই পাঁচ শহীদের স্মরণ সভায় তাদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

কুড়িগ্রাম কারা সূত্রে জানা গেছে, সেদিনের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া আব্দুল জলিল এখনও জীবিত আছেন এবং বগুড়ায় অবসর জীবনযাপন করছেন। তবে তিনিও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।

সেদিনের ঘটনার ব্যাপারে কুড়িগ্রামের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৭ এপ্রিল লালমনিরহাট এবং রংপুর থেকে সাঁজোয়া বহর নিয়ে গুলি করতে করতে বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি হানাদাররা। এরপর উপ-কারাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ হেদায়েত উল্লাহ এবং কারারক্ষী লাল মোহাম্মদ প্রামাণিক, আনসার আলী আকন্দ, সাজ্জাদ হোসেন, ফকর উদ্দিন ও আব্দুল জলিলকে ডেকে নিয়ে সার্কিট হাউসের সামনের রাস্তার পূর্ব প্রান্তের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ-ফায়ার করে। এতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন লাল মোহাম্মদ প্রামাণিক, আনসার আলী আকন্দ, সাজ্জাদ হোসেন ও ফকর উদ্দিন। উরুতে গুলি লেগে গুরুতর আহত হন শেখ হেদায়েত উল্লাহ ও আব্দুল জলিল। পাকিস্তানি বাহিনী চলে গেলে ওই এলাকার বাসিন্দা শাহাদৎ হোসেন ও মাহফুজার রহমান চৌধুরী আহত শেখ হেদায়েত উল্লাহ ও আব্দুল জলিলকে উদ্ধার করেন। কিন্তু ওইদিন রাত ১১টার দিকে হেদায়েত উল্লাহ মারা যান।

মুক্তিযোদ্ধারা আরও জানান, ওই দিন রাতে স্থানীয় বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা হারুনুর রশিদ লাল, মতিউল ইসলাম চৌধুরী নয়া এবং রজব আলী চার শহীদ কারারক্ষীর লাশ উদ্ধার করেন। পরের দিন সকাল ১০টা-১২টার মধ্যে বর্তমান জেলা কারাগারের প্রবেশপথের দক্ষিণে কারা প্রাচীর সংলগ্ন আবাদি জমির মধ্যে ইউনিফর্ম পরা অবস্থাতেই চার শহীদকে সমাহিত করা হয়। পরে কারাগারের পশ্চিম প্রান্তে সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আব্দুস ছালামের বাড়ির উঠানে সমাহিত করা হয় শেখ হেদায়েত উল্লাহকে।

স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা

শনিবার (৭ এপ্রিল) কারাগার প্রাঙ্গণে আয়োজিত স্মরণসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধা ও সলিডারিটি কুড়িগ্রামের নির্বাহী পরিচালক হারুনুর রশিদ লাল বলেন, ‘একাত্তরের ৩১ মার্চ কুড়িগ্রাম শহরের পুলিশ, আনসার, ছাত্র-জনতা এবং ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদস্যদের নিয়ে যে সম্মিলিত বাহিনী গড়ে তোলা হয়, তাতে শেখ হেদায়েত উল্লাহসহ শহীদ কারারক্ষীরাও ছিলেন। তারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। ইচ্ছে করলে তারা পালিয়ে গিয়ে জীবন বাঁচাতে পারতেন। সরকারের উচিত, তাদের শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া।’

হারুনুর রশিদ লাল আরও বলেন, ‘আমার চোখের সামনে কাররক্ষীদের শহীদ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সেদিন আমাদের হাতের কাছে অস্ত্র ছিল না। আমাদের অস্ত্র সে সময় দূরে রাখা ছিল। তা না হলে আমরা তখনই প্রতিরোধ গড়ে তুলতাম। কিন্তু আকস্মিক এ ঘটনায় আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। পরে এই সহযোদ্ধাদের দাফনের ব্যবস্থা করি।’

স্মরণসভায় উপস্থিত শহীদ লাল মোহাম্মদ প্রামাণিকের মেয়ে জাহানারা বেগম এবং ছেলে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘একাত্তরের ৭ এপ্রিল আমাদের বাবা শহীদ হওয়ার পর থেকে আমরা চিরতরে পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের ৬ ভাইবোনকে নিয়ে জীবন-সংগ্রাম করতে করতে মাও মারা গেছেন। আমরা চাই আমাদের বাবাসহ সেদিন পাকিস্তান বাহিনীর গুলিতে নিহত অন্য কারারক্ষীদের শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হোক।’

একই দাবি জানিয়েছেন শহীদ কারারক্ষী সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে মো. শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যকে আর ফিরে পাব না। দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তারা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। আমাদের একটাই চাওয়া, রাষ্ট্র তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দিক। তাতে অন্তত শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সম্মান বোধ করবে।’ একই সঙ্গে শহীদদের সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

শহীদ কারারক্ষীদের স্বীকৃতির ব্যাপারে জেল সুপার মো. উমর ফারুক বলেন, ‘যতদূর জেনেছি, এ ব্যাপারে শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করবেন।’

 

 

/এএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান, নিয়োগ পেলেন তিন কমিশনার
বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান, নিয়োগ পেলেন তিন কমিশনার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের বিজয়ে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের বিজয়ে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন
ইরানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: খামেনি
ইরানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: খামেনি
ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭টি ওয়ার্ড
ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭টি ওয়ার্ড
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের