আসন্ন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের মন জয় করতে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম ও তার সমর্থকরা ভোটারদের কাছে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। একইসঙ্গে সরকারের ভবিষ্যত কর্মকাণ্ডও তুলে ধরেও ভোটারদের মন পেতে চেষ্টা করছেন তারা। আর বিএনপি নেত্রীকে মিথ্যা মামলায় জেল খাটানোর অভিযোগ এবং সরকারের কর্মকাণ্ডকে ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দিয়ে নানা অভিযোগ তুলে মানুষের কাছে ভোট চাইছেন বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার ও তার কর্মী-সমর্থকেরা। প্রার্থীর তুলনামূলক যোগ্যতার প্রচার দিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায়েও সচেষ্ট রয়েছেন তারা।
তবে উভয় দলই আশা করছে, তারাই নির্বাচনে জয়ী হবে।
গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ও স্থানীয় উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনা দিয়েছেন। দেশবাসী তা দেখেছে এবং আমরাও এ বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। জাতীয় উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়নের জন্য শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের মনোনীত দক্ষ, ভালো, সিটি মেয়র দরকার, যিনি তার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করবেন। সে কারণেই মানুষেরও নৌকার প্রতিনিধির দরকার। কাজেই নৌকা প্রতীক যিনি পেয়েছেন মানুষ তাকে তথা মো. জাহাঙ্গীর আলম তাকে ভোট দেবে।’
এ ব্যাপারে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচন সন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মো. আজমত উল্লাহ বলেন, ‘জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভোটারদের কাছে আমরা তুলে ধরছি। সরকারের ভবিষ্যত কর্মকাণ্ডও তুলে ধরছি। মানুষ উন্নয়ন চায়। উন্নয়নের জন্য মাননীয় জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রার্থী, নৌকার প্রার্থীকেই মানুষ ভোট দিতে উৎসাহিত হবে।’
প্রসঙ্গত, আজমত উল্লাহ খান গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি তিনি নিজেও একটি কর্মপরিকল্পনা করেছেন, যা বিগত মেয়র করতে পারেননি। যেমন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাস্টারবাড়ী পর্যন্ত উন্নত মানের সড়ক নির্মাণ। কল কারখানার জন্য আলাদা জোন, কর্মজীবী মানুষের বসবাসের জন্য আলাদা জোন, ময়লা পরিষ্কারের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে অপসারণ প্রক্রিয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য মহানগরবাসীদের সমন্বয়ে বৈজ্ঞানিক কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করা হবে। এসব বিষয়ে ভোটারদের অবহিত করা হচ্ছে, তাদের কাছে ভোট প্রার্থনা করা হচ্ছে।’
বিএনপি জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকেরা সরব রয়েছেন সরকারের নেতিবাচক দিকগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরায়। তারা বলছেন,
রাজনীতিবিদসহ সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি, জেলে ঢোকানো এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উন্নয়ন কাজে বাধা দিচ্ছে সরকার। ব্যক্তি অধিকার, ভোটের অধিকার মানুষের নেই। এছাড়াও প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সুনাম, দুর্নীতিমুক্ত থাকা, শিক্ষা, বিএনপির সময়ের নানা উন্নয়নে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও যোগাযোগ উন্নয়নের নানা ব্যাখ্যা দিয়েও ভোট প্রার্থনা করছেন বিএনপি প্রার্থী ও তার সমর্থক নেতাকর্মীরা।
গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন বলেন, ‘সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে দিয়েছে। সরকারের সব অনিয়ম আমরা মানুষের কাছে উপস্থাপন করছি। মানুষের সাড়া পাচ্ছি। সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপি সমর্থিত ব্যক্তি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র হবে, ইনশাল্লাহ।’
গাজীপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আলহাজ্ব সালাউদ্দিন সরকার বলেন, ‘গত মেয়র নির্বাচনে নেত্রী মুক্ত ছিলেন। এবারের নির্বাচনে নেত্রী জেলে রয়েছেন। বিএনপির প্রতি সরকারের নির্যাতনের ফলে মানুষের মধ্যে সিমপ্যাথি (সহমর্মিতা) সৃষ্টি হয়েছে। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে জয়লাভ করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন গাজীপুর থেকেই শুরু হবে।’
প্রার্থীর যোগ্যতার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর চাইতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সুনাম সবকিছুই বেশি। তিনি তার মেয়াদে নানা কাজ করেছেন। তার প্রায় ৭০ বছরের জীবনে কোনও দুর্নীতি নেই।’
গাজীপুর জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব উদ্দিন বলেন, ‘অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানবাধিকারসহ নানাভাবে মানুষ নির্যাতিত। বিএনপি এবং নেতাকর্মী, সমর্থকেরা নিপীড়িত। মানুষ তা দেখেছে এবং দেখছে। আর এ বার্তাটি ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। ফলে জনগণ বিএনপির প্রতি দুর্বল হচ্ছে এবং বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দেবে।’
সোহরাব উদ্দিন বলেন, ‘গত নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী এক লাখের বেশি ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। সেই জনপ্রিয় মেয়রকে মাত্র ৬ মাসের মাথায় অনেকগুলো মিথ্যা মামলা দিয়ে উন্নয়নমূলক কোনও কাজই করতে দেয়নি। জনপ্রিয় মেয়রকে জেলে ঢুকিয়ে সরকারের লোকজন টেন্ডারের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে খেয়েছে। এজন্যই কাঙ্খিত উন্নয়নকাজ করতে দেওয়া হয়নি।’
গাজীপুর জেলা বিএনপির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব মো. আবুল কালাম আজাদ তাদের প্রার্থীকে সব দিক থেকে এগিয়ে রাখেন। বলেন,‘বিএনপির প্রার্থী একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি টঙ্গী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সাংসদ এবং গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন।’
গাজীপুর জেলা বিএনপির সাদারণ সম্পাদক কাজী সাইয়্যেদুল আলম বাবুল বলেন, ‘আওয়ামী সরকারের দুঃশাসনের সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। মানুষও সরকারের দুঃশাসনের বিষয়ে অবগত। এখন সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার।’
শুক্রবার (২৮ এপ্রিল) মহানগরের বড়াবাড়ি এলাকায় গণসংযোগ করে স্থানীয় মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রাথী মো. জাহাঙ্গীর আলম। ওই এলাকার একটি পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যবস্থাপক হিসেবে চাকরি করেন মো. জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘গণসংযোগের সময় তাদের সঙ্গে কথা বলেন মেয়র প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি কল-কারখানার জন্য আলাদা জোন, কর্মজীবী মানুষের বসবাসের জন্য আলাদা জোন, ময়লা পরিষ্কারের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে অপসারণ প্রক্রিয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণসহ নানা কথা বলেন।’ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘গাজীপুর মহানগরের উন্নয়নের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় বিশেষ প্রকল্প প্রণয়ন, বরাদ্দ এবং বিদেশি এক্সপার্টদের পরামর্শে উন্নয়নকাজ পরিচালনার কথাও ব্যক্ত করেন মেয়র প্রার্থী।’
শুক্রবার শুক্রবার গাছা এলাকায় গণসংযোগ করেন বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। পরে স্থানীয় মসজিদে জুমার নামাজ পড়েন তিনি। হাসান উদ্দিন সরকারের গণসংযোগের মুখোমুখি হন স্থানীয় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক তোহফাতুল হাসান। তিনি বলেন, ‘এলাকার অনেকেই ছিলেন। বিএনপির ওই প্রার্থী বলেন, বর্তমান সরকার মানুষের মৌলিক অধিকার, ভোটের অধিকার বঞ্চিত করেছে। প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদদের নামে মিথ্যা মামলা, হামলা দিয়ে হয়রানি করছে। এসব নানা অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।’ তোহফাতুল হাসান বলেন, ‘নির্বাচিত হলে সরকার কোনও মামলা দেওয়ার প্রক্রিয়া করলে ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে তার জবাব দেওয়ার কথাও বলেন মেয়র প্রার্থী।’








