চার বছর ধরে মর্গে থাকা নীলফামারীর ধর্মান্তরিত হোসনে আরা লাইজু (নীপা রানী রায়)-এর লাশ তার শ্বশুর জহুরুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ। হাইকোর্টের আদেশনামা নিয়ে ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমার নেতৃত্বে ডোমার থানার পুলিশসহ লাইজুর শ্বশুর বাড়ির স্বজনরা উপস্থিত হলে শুক্রবার (৪ মে) বেলা ১২টার দিকে হাসপাতালের পরিচালক ড. অজয় কুমার লাশ হস্তান্তর করেন।
পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে শ্বশুর বাড়ি নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার বোড়াগাড়ি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় লাইজুর লাশ। স্বজনরা জানান, সেখানেই আজ বিকালে লাইজুর লাশ দাফন করা হবে।
এ ব্যাপারে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. অজয় কুমার বলেন, ‘আইনি জটিলতার কারণে ৪ বছরের অধিক সময় ধরে হোসনে আরা লাইজু ওরফে নীপা রানীর মরদেহ হাসপাতালের হিম ঘরে ছিল। কিন্তু বৈদ্যুতিক সমস্যাসহ নানা কারণে হিমঘরে লাশ রাখার মতো কোনও অবস্থা নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনেকবার বলার পরেও কাজ হয়নি। তবে হাইকোর্টের আদেশনামা পাওয়ার পর লাশটি হস্তান্তর করতে পেরে আমাদের ভালো লাগছে।’
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশ গ্রহণ করতে আসা ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা বলেন, ‘আমরা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী লাশ গ্রহণ করতে হাসপাতালে এসেছি। লাশ দাফন না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানে (লাইজুর শ্বশুর বাড়িতে) থাকবো।’
এক প্রশ্নের উত্তরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘যেহেতু আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে- লাশ মুসলিম বিধান মতে দাফন করতে হবে, তারপরও মেয়েটির বাবাসহ স্বজনরা চাইলে শেষবারের মতো লাশ দেখতে পারেন। কিন্তু এ ব্যাপারে মেয়েটির বাবা অক্ষয় কুমারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলা হলেও তিনি জানিয়েছেন-তারা লাশ দেখবেন না।’
লাশ গ্রহণ করতে রংপুর মেডিক্যাল কলেজে উপস্থিত ছিলেন হোসনে আরা লাইজুর শ্বশুর জহুরুল ইসলাম। তিনি জানান, ছেলে হুমায়ুন ফরিদ মারা যাওয়ার আগে বলে গিয়েছে যে, তার স্ত্রীর লাশ যেন তার কবরের পার্শ্বেই দাফন করা হয়। সে কারণে অনেক আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে পুত্রবধূর লাশ আদালতের নির্দেশে দাফন করার আদেশ পেয়েছি। আজই জানাজা শেষে লাশ দাফন করা হবে।
উল্লেখ্য, হোসেনে আরা লাইজু ওরফে (নীপা রানী) প্রেম করে একই এলাকার হুমায়ুন ফরিদের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। এসময় তিনি মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেন। এ ঘটনায় নীপা রানীর বাবা অক্ষয় কুমার বাদী হয়ে ডোমার থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে নীপা রানীকে তার বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনার পর ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি নীপা রানীর স্বামী হুমায়ুন ফরিদ বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন।
স্বামীর মৃত্যুর ৫৪ দিন পর, একই বছরের ১০ মার্চ দুপুরে বাবার বাড়িতে নিজের শোয়ার ঘরে সবার অগোচরে কীটনাশক পান করেন লাইজু ওরফে নীপা রানী। পরে তাকে ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ডোমার থানা পুলিশ হাসপাতাল থেকে মেয়েটির মরদেহ রাতেই উদ্ধার করে। পরের দিন (১১ মার্চ) নীলফামারী জেলার মর্গে মেয়েটির মরদেহ ময়নাতদন্ত করা হয়। ওইদিন পুত্রবধূ দাবি করে লাজুর বাবা জহুরুল ইসলাম ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক লাইজুর দাফনের আবেদন করেন। তবে মেয়েটির বাবা অক্ষয় কুমার রায় হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে মেয়ের সৎকারের জন্য নীলফামারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন। আদালত উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে লাইজুর মরদেহ তার শ্বশুরের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে লাইজুর বাবা আপিল করেন। এরপর জজ আদালত লাইজুর মরদেহ তার বাবার কাছেই হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেন তার শ্বশুর। সেই আবেদনের নিষ্পত্তি করে মুসলিম রীতিতে লাশ দাফনের আদেশ দেন হাইকোর্ট।
বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত লাইজুর মরদেহ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরেই রাখা হয়।
আরও খবর:
চার বছর মর্গে থাকা ধর্মান্তরিত লাইজুর লাশ মুসলিম রীতিতে দাফনের নির্দেশ








