পাহাড়ে আবারও আতঙ্ক

জিয়াউল হক, রাঙামাটি
০৪ মে ২০১৮, ২৩:৪২আপডেট : ০৫ মে ২০১৮, ২১:৪১

দুর্বৃত্তের হামলায় উল্টে যাওয়া মাইক্রোবাসের পাশে পুলিশ (ফাইল ছবি) আবারও আতঙ্ক বাড়ছে পাহাড়ে। কোথায় কখন কার লাশ পড়ে, সেই ভয়-আতঙ্কই যেন তাড়া করে ফিরছে পাহাড়ের মানুষকে। সম্প্রতি পাহাড়ে আবারও বেড়েছে খুন-গুম-হত্যা। প্রতিদিন কারও না কারও রক্তে লাল হচ্ছে পাহাড়ের সবুজ জনপদ। শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্তি পার হতে না হতেই আবারও সহিংস হয়ে উঠেছে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো। যে আশা নিয়ে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল সেই শান্তি এখনও পায়নি পাহাড়ের সাধারণ মানুষ। পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের কারণে মানুষকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে আর হানাহানি লেগে আছে বলে মনে করছেন সাধারণ লোকজন। যত তাড়াতাড়ি পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা যাবে তত দ্রুতই পাহাড়ে শান্তি ফিরবে বলে মনে করেন সাধারণ লোকজন।

গত বছর ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্তি অনুষ্ঠানে রাজধানীতে দ্য ডেইলি স্টার ভবনে এক সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা বলেছিলেন, চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে পাহাড়ে আগুন জ্বলবে।

এ বছরের শুরু থেকে এই পর্যন্ত প্রায় ১০/১২ জনের মতো নিহত হয়েছেন বলে জানা যায়। নিহতদের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং আওয়ামী লীগের দলের লোকজন রয়েছেন। তবে জাতীয় ও আঞ্চলিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের হত্যা-পাল্টা হত্যার ঘটনা ঘটলেও একেবারে চুপচাপ রয়েছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের প্রধান আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস। তাদের কোনও নেতাকর্মী এ বছর হত্যাকাণ্ডের শিকার না হলেও প্রতিপক্ষের অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছে বারবার। কিন্তু প্রতিবারই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।

গত বছরের ৫ ডিসেম্বর সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউপিডিএফ সদস্য অনাদি রঞ্জন চাকমাকে (৫৫) গুলি করে হত্যা করা হয়। রাঙামাটির নানিয়ারচরের চিরঞ্জীব দর্জিপাড়া এলাকায় বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করা হয় তাকে। একই দিন বিকালে বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রামচরণ মারমা ওরফে রাসেল মারমাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় ১০-১২ জন দুর্বৃত্ত। ওইদিনই রাত ৮টার দিকে জুরাছড়ি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি অরবিন্দু চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

অরবিন্দু চাকমা হত্যার প্রতিবাদ করায় গত ৬ ডিসেম্বর রাতেও সহিংসতার আরেকটি ঘটনা ঘটে। রাঙামাটি জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ঝর্ণা খীসাকে (৫৫) ওইদিন মধ্যরাতে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে তার পরিবারের সদস্য জিতেন্দ্র লাল চাকমা (৬৫) ও রমন কৃষ্ণ চাকমাকেও (২৮) কুপিয়ে জখম করা হয়।

এ বছরের জানুয়ারিতে অনিল নামের একজনকে হত্যা করা হয়। খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমা, বাঘাইছড়ির বিজয় চাকমা ও তপন চাকমা, গত ১৫ এপ্রিল সমাজকর্মী সূচি বিকাশ চাকমা, ২২ এপ্রিল খাগড়াছড়িতে পানছড়ির ইউপিডিএফ সমর্থিত নতুন কুমার চাকমা নিহত হন। গত বৃহস্পতিবার (৩ মে) রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন। সবশেষ শুক্রবার (৪ মে) শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক এর আহ্বায়ক তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাসহ ৫ জন নিহত এবং অন্তত ৯ জন আহত হন। নিহতরা হলেন, ইউপিডিএফের আহ্বায়ক তপনজ্যোতি চাকমা, সজীব চাকমা,  সেতুলাল চাকমা, সজল চাকমা ও টনক চাকমা।

পাহাড়ের এসব হত্যাকাণ্ডে সাধারণত পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয় না। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও এখনও পর্যন্ত তার কোনও সুরাহা পাওয়া যায়নি।

শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করলেও এক বছরের মাথায় চুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এরপরই ফের শুরু হয় পাহাড়ে রক্তের খেলা। ২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে রূপায়ণ দেওয়ান-সুধাসিন্ধু খীসাদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)। এতদিন এই দুই সংগঠন অনেকটা এক হয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে গেলেও গত বছর আত্মপ্রকাশ করে পাহাড়ের চতুর্থ আঞ্চলিক সশস্ত্র দল ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এই চার সংগঠনের ক্ষমতা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বের কারণে আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা বর্মা দল গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হলেন।

মূলত পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে আধিপত্য ও চাঁদাবাজির এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈরিতা থাকলেও চার দলই একে আদর্শিক সংঘাত বলে দাবি করে থাকে। অবশ্য তাদের এই দাবি বিশ্বাস করার লোক পাহাড়ে হাতেগোনা।

নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা শক্তিমান চাকমা এবং ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক এর আহ্বায়ক তপনজ্যোতি চাকমা ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমা অপহরণ মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন। এ বছর খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমা হত্যা মামলার এজাহারেও আসামি হিসেবে শক্তিমানের নাম ছিল।

তপনজ্যোতি চাকমা বর্মার হত্যাকান্ডের জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করেছেন ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক এর মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্বে থাকা লিটন চাকমা। তিনি বলেন, শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করার পর তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাকে হত্যার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে একক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য তারা একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে।

তবে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর মুখপাত্র নিরন চাকমা বলেন, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের ঘটনার সঙ্গে আমাদের দলের কোনও সম্পৃক্ততা নেই। তিনি আরও বলেন, যারা তাদের সৃষ্টি করেছে, আবার তাদের প্রয়োজনে তাদের হত্যা করতে পারে বলে মনে হচ্ছে। ইউপিডিএফ বারবার বলে আসছিল ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক এর কারণে পাহাড়ে হত্যার রাজনীতি শুরু হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ হত্যাকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, রাঙামাটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তবে দুদিনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। থানায় এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেনি।

/এএম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক