টমেটো চাষ করে লোকসানের মুখে দিনাজপুরের কৃষকরা

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
০৭ মে ২০১৮, ১২:০০আপডেট : ০৭ মে ২০১৮, ১২:০০

গাবুড়া বাজার

দেশের উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ গ্রীষ্মকালীন টমেটো উৎপাদনের জেলা দিনাজপুর। কিন্তু এ মৌসুমে ‘লাভজনক’ এই ফসল আবাদ করে দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন এই জেলার চাষিরা। অধিক লাভের আশায় বাড়তি টাকা খরচ করে এখন লোকসানের মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

ব্যবসায়ীদের দাবি, এবার একইসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে টমেটো উঠেছে, তাই কারোরই লাভ হচ্ছে না। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারিভাবে হিমাগার নির্মাণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, এই জেলায় ব্যাপকহারে গ্রীষ্মকালীন ‘নাভি জাতের’ টমেটোর চাষ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ না থাকায় এবারও টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ ফলন পেয়েও খুশি নন কৃষকরা। কারণ এবার উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে টমেটো বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের, ফলে লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার সদর উপজেলার শেখপুরা ইউনিয়নের গর্ভেশ্বরী নদীর তীর ঘেঁষে গাবুড়ায় বসছে উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ গ্রীষ্মকালীন টমেটোর বাজার। ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলমান এই বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৭শ’ টন টমেটো বেচাকেনা হয়। ঢাকা, সিলেট, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় এসব টমেটো কিনে নিয়ে যায় ব্যবসায়ীরা।

গাবুড়া বাজার

কৃষকরা জানিয়েছে, এক একর জমিতে টমেটো উৎপাদন করতে শ্রম ছাড়াই খরচ হয় প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। এই পরিমাণ জমিতে প্রায় ২০ টন টমেটো উৎপাদন হয়। এ মৌসুমে বাজারের প্রথম দিকেই টমেটো বিক্রি করতে হয়েছে ১২০ থেকে দেড়শ’ টাকা মণ দরে। এতে করে পুরোপুরি লোকসানে পড়েছেন কৃষকরা।

টমেটো চাষিদের দাবি, বর্তমানে দাম সাড়ে ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা মণ হলেও, প্রথম দিকে যে কম দামে টমেটো বিক্রি করতে হয়েছে তাতেই লোকসানে পড়বেন তারা। তাছাড়া বর্তমানে দাম বেশি হলেও টমেটো প্রায় শেষের দিকে।

কৃষক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম দিকে ১২০ থেকে দেড়শ’ টাকা মণ দরে টমেটো বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু টমেটোর যে উৎপাদন খরচ তাতেই মণপ্রতি মূল্য পড়ে যায় প্রায় ২০০ টাকা। আর সঙ্গে রয়েছে খাজনা, শ্রমিকের মূল্য ও পরিবহন খরচ। যাতে করে টমেটো মনপ্রতি বিক্রি হওয়ায় উচিত কমপক্ষে ৩০০ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকা।’

তিনি আরও জানান, বর্তমানে এই দামে টমেটো বিক্রি হলেও প্রথম দিকে যে মূল্যে টমেটো বিক্রি করতে হয়েছে তাতেই লোকসানে পড়তে হবে। তাছাড়া বর্তমানে দাম বেশি হলেও গাছের টমেটো শেষের দিকে।

কৃষক স্বপন চন্দ্র দাস জানান, গত বছরের তুলনায় এবারে টমেটোর ফলন ভাল। কিন্তু দাম একেবারেই নেই। গত বছরেও তাদের লোকসানে পড়তে হয়েছিল রোগবালাইয়ের জন্য। আর এবারে দাম না পেয়ে লোকসানে পড়তে হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা টমেটোর আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।

দাম কমের ব্যাপারে টমেটোর ক্রেতা পাইকাররা বলছেন, এখানকার মতো ঢাকাসহ অন্যান্য শহরেও টমেটোর দাম কম। যার কারণে তারা ভালো ব্যবসা করতে পারছেন না। তাছাড়া বাজারে টমেটোর আমদানি অনেক বেশি থাকায় দাম কম।

গাবুড়া বাজার

টমেটো ব্যবসায়ী কালাম জানান, যদি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চাহিদা থাকতো, তাহলে বাজার ভাল হতো। চাহিদা না থাকায় দাম কম। তবে দিনে দিনে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তিনি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘যদি রাস্তাঘাটে যানজট কম হতো এবং কাঁচাপণ্য হিসেবে টমেটো পরিবহনের গাড়িগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে ব্যবসায়ীরা কিছুটা লাভবান হতে পারতেন। কারণ, টমেটো পচনশীল পণ্য, বেশি সময় গেলে অনেক টমেটোই বিক্রির অযোগ্য হয়ে পড়ে।’

ঢাকা থেকে আগত টমেটো ব্যবসায়ী সেলিম পারভেজ জানান, ‘এবারে পঞ্চগড়, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্নস্থানে প্রায় একইসঙ্গে টমেটো উৎপাদন হয়েছে। যার কারণে দাম কম। ব্যবসা করে ব্যবসায়ীরাও লাভবান হতে পারেনি।’  

গাবুড়া টমেটো বাজারের ইজারাদার মমিনুল ইসলাম জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে এই বাজারটি টমেটোর বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতিদিন এই বাজারে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টন টমেটো বেচাকেনা হয়। যা দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। তবে এবারে টমেটো আবাদ করে এই এলাকার কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার কৃষকরা টমেটোর হিমাগার নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। টমেটোর মূল্য বৃদ্ধি করতে সরকারিভাবে হিমগার নির্মাণ ও টমেটো প্রক্রিয়াজাতকরণ করা উচিত।’ একইসঙ্গে এখান থেকে যেসব টমেটোবাহী যানবাহন যায়, সেগুলো যাতে দ্রুত বাজার ধরতে পারে এজন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি।

দিনাজপুর কৃষক সমিতির সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল বলেন, ‘এবারে টমেটো চাষ করে কৃষকরা চরম লোকসানে পড়েছেন। যাতে করে কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার কর্তৃক কৃষকদের ভর্তুকি কিংবা ক্ষতিপুরণ প্রদান করা উচিত।’ এছাড়াও টমেটো চাষ করে কৃষকরা যাতে করে আগামীতে লোকসানে না পড়ে সেজন্য সরকারি উদ্যোগে হিমাগার নির্মাণ করা সময়ের দাবি বলে মনে করেন তিনি।

এ ব্যাপারে দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক তৌহিদুল ইকবাল জানান, চলতি বছরে দিনাজপুরে প্রায় ২ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে টমেটোর আবাদ করা হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ হাজার মেট্রিক টন।’

 

 

/এএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মানুষ, বাড়ছে বিদ্যুতের দাম এরপর কী
মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মানুষ, বাড়ছে বিদ্যুতের দাম এরপর কী
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত কমিটি
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত কমিটি
কট্টরপন্থি ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
কট্টরপন্থি ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম