শক্তিমান-তপনজ্যোতি হত্যার নেপথ্যে নানিয়ারচরের নিয়ন্ত্রণ!

জিয়াউল হক, রাঙামাটি
০৮ মে ২০১৮, ১১:৩৪আপডেট : ০৮ মে ২০১৮, ১১:৪৫

শক্তিমান চাকমা ও  তপনজ্যোতি চাকমা রাঙামাটির জেলা সদরের উত্তরে ছোট্ট উপজেলা নানিয়ারচর। আয়তন মাত্র ১৪৯ বর্গমাইল। শহর থেকে  দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। উপজেলার উত্তরে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা, দক্ষিণে রাঙামাটি সদর, পূর্বে লংগদু ও বরকল উপজেলা, পশ্চিমে খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা। বলা হয়ে থাকে, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে নানিয়ারচরের রাজনীতির ওপর যাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে, খাগড়াছড়ির মহালছড়ির রাজনীতিও তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে নানিয়ারচরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা বা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ওপর নির্ভর করছে, মহালছড়ির ভাগ্যও।

নানিয়াচরকে বলা হয়, ইউপিডিএফ-এর সুরক্ষিত ও সবচেয়ে শক্তিশালি ঘাঁটি। তবে গত একবছর ধরে তারা সেখানে যেতে পারেনি। নানিয়ারচর অশান্ত হওয়ার পেছনে এই ‘নিয়ন্ত্রণ’ ইস্যু রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণেই উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নেতা তপনজ্যোতি চাকমাসহ ছয় জনকে প্রাণ হারাতে হয়েছে।

তবে বিষয়টিকে খুব সহজ বলে মনে করছেন না পার্বত্য রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা। তাদের ধারণা, আগামী দিনগুলোতে পাহাড়ের রাজনীতিতে আরও বড় ধরনের মেরুকরণ ঘটতে যাচ্ছে।

১৯৮৩ সালের ১ আগস্ট উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নানিয়ারচর।  সাবেক্ষং,নানিয়ারচর,বুড়িঘাট ও ঘিলাছড়ি এই চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নানিয়ারচর উপজেলা। উপজেলাটি প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর। এদিন নানিয়ারচর বাজারে তৎকালীন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ নেতাদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে তা সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রূপ নেয়। ওই ঘটনায় নিহত হন বেশ কয়েকজন পাহাড়ি।

১৯৯৭ সালে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধিতা করেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা প্রসিত বিকাশ খীসা। ওই সময় তার নেতৃত্বে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। রাঙামাটি জেলার প্রতিটি উপজেলা থেকে প্রত্যন্ত এলাকায় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) দাপিয়ে বেড়ালেও একমাত্র নানিয়ারচরেই গত ১৮ বছরেও পা ফেলতে পারেনি সংগঠনটি। এমনকি সন্তু লারমা নিজেও কখনও সেখানে যেতে পারেননি। এই উপজেলা সড়কেই তার গাড়ি বহরে দুই দফা হামলা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে তাতিন্দ্রলাল চাকমা পেলে, সুধাসিন্ধু খীসা,শক্তিমান চাকমা গঠন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন-লারমা) নামে নতুন রাজনৈতিক দল। নবগঠিত দলটির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে ইউপিডিএফ-এর। সেই বন্ধুত্বে চিড় ধরে গত উপজেলা নির্বাচনে। এসময় দল দু’টি বন্ধু থেকে শত্রু হতে শুরু করে।  আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয় শক্তিমান চাকমার কাছে হেরে যায় ইউপিডিএফ প্রার্থী সুশীল জীবন চাকমা। গত একবছরে নানিয়ারচর সদরে প্রবেশও করতে পারেনি ইউপিডিএফ। পালন করতে পারেনি কোন কর্মসূচিও। ইউপিডিএফ-এর ঘাঁটি নানিয়ারচর হয়ে ওঠে যায় এমএন-লারমা’র নানিয়ারচর। বিষয়টি মানতে পারছিল না ইউপিডিএফ। এই সময়ে  ঘটে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

২০১৬ সালে পার্বত্য রাজনীতিতে একটি বড় মেরুকরণের ঘটনা ঘটে। সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতির সঙ্গে চিরশত্রু প্রসিত খীসার ইউপিডিএফ’র মধ্যে সমঝোতা হয়। আর ২০১৭ সালে ইউপিডিএফ’র বিদ্রোহী একটি অংশ তপনজ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে পৃথক আরেকটি দল গঠন করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা)ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)এর মধ্যে তৈরি হয় নয়া মেরুকরণ। একদিকে, নানিয়ারচরে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে শক্তিমান চাকমার ওপর ক্ষোভ, অন্যদিকে  একের পর এক নেতাকর্মী হত্যার জন্য তপনজ্যোতি চাকমার ওপর ক্ষোভ জমতে থাকে ইউপিডিএফ’র। এর মধ্যে গত মার্চ মাসে ইউপিডিএফ’র সহযোগী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের  দুই শীর্ষ নেত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক। প্রায় ৩২ দিন পর তারা মুক্তি পেলে ইউপিডিএফ এ ঘটনার জন্য দায়ী করে তপনজ্যোতি চাকমাকে। সঙ্গত কারণেই শক্তিমান চাকমা ও তপনজ্যোতি চাকমা তাদের মূল টার্গেটে পরিণত হয়।

যে নানিয়ারচরে যেতেই পারতো না ইউপিডিএফ নেতাকর্মীরা, সেখানে ২৪ ঘণ্টার ব্যবাধানে হত্যা করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা)অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমা এবং এবং তার দাহক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়া তপনজ্যোতি চাকমাসহ পাঁচ জনকে। তাদের মৃত্যুর পর সেখানে ইউপিডিএফ’এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে বলেই অনেকে ধারণা করছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএনলারমা)সহ-সম্পাদক প্রশান্ত চাকমা বলেন, ‘আমরা সব সময় চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলি, আর ইউপিডিএফ সব সময় চুক্তি বিরোধী। ইউপিডিএফ চুক্তি বিরোধী বলে সবসময় মানুষ হত্যা করে। আমরাও শুনেছি, ইউপিডিএফ’র সঙ্গে জেএসএস’র একটি নির্বাচনি সমঝোতার কথা।’

তিনি আরও বলেন, ‘নানিয়ারচর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা তারা সবসময় করেছে। তারা চিন্তা করেছে, চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করে উপজেলার রাজনীতি তারা নিয়ন্ত্রণ নেবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের পছন্দ করে না। তাই তারা পারবে না। আমরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে আছি।’

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর অন্যতম সদস্য লিটন চাকমা বলেন, ‘গত পাঁচ মাস হলো আমাদের সংগঠনের জন্ম। এই অল্প সময়ে আমাদের দলের জনপ্রিয়তা দেখতে পারছে না ইউপিডিএফ। তারা চিন্তা করেছিল— যদি তপনজ্যোতি চাকমাকে হত্যা করা হয়, তাহলে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ভেঙে যাবে। তখন তারা নানিয়ারচর দখল নেবে। আর আমাদের কর্মীদের তাদের দলে যাবে। আমরা রবিবার (৬ মে) জালেয়া চাকমাকে সভাপতি এবং উজ্জল কান্তি চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি গঠন করেছি।’

 

 

/এসটি/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম