বেড়িবাঁধে টংঘর, কালাবগির নতুন নাম ‘ঝুলনপাড়া’

হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
২৭ মে ২০১৮, ০৭:৫৬আপডেট : ২৭ মে ২০১৮, ১৭:৩৪

খুলনার দাকোপ উপজেলার কালাবগিতে বেড়িবাঁধের পাশে নির্মিত টং ঘর ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে ২০০৯ সালের ২৫ মে প্রবল জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয় খুলনার দাকোপ ও কয়রা এলাকা। জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচতে সেই সময় বেড়িবাঁধে টংঘর পেতে বসবাস শুরু করে দাকোপের কালাবগি এলাকার বিপন্ন মানুষেরা। গত ৯ বছরেও আইলার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেননি তারা। ফিরে যেতে পারেননি নিজেদের আগের ঠিকানায়। টংঘরেই চলছে তাদের ঘর-সংসার। আর এসব টংঘরের কারণেই ধীরে ধীরে কালাবগির নতুন নাম হয়ে গেছে ‘ঝুলনপাড়া’।

দাকোপ উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, আইলায় দাকোপ উপজেলার ২৯ হাজার ১৩২টি পরিবারের এক লাখ তিন হাজার ৭০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া, তিন হাজার ২৮০ একর আবাদি জমি, ৩৩ হাজার ৪১৬টি বসতবাড়ি, ২৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৫৬৩ কিলোমিটার রাস্তা এবং ১১৮ কিলোমিটার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবাদিপশু ও অন্যান্য সহায় সম্পদ মিলে ক্ষতির পরিমাণ ছিল হাজার কোটি টাকার বেশি। ৯ বছর পরও আইলা আক্রান্ত এই এলাকার মানুষের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ।

দাকোপের আইলা আক্রান্ত কালাবগির ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি এলাকার কয়েকশ’ মানুষ বেড়িবাঁধের ওপরে এবং বাঁধ ঘেঁষে টংঘর নির্মাণ করে আছে। তারা অনেকটা নদীর চরে ঝুলে বসবাস করছে। তাই এলাকাটির নাম হয়েছে ‘কালাবগি ঝুলনপাড়া’। এই ঝুলনপাড়ার একটি অংশ কালাবগি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। চারপাশে কোনও বাঁধ নেই। কোনও রকমে টংঘর তুলে রাখা হয়েছে। নদীতে জোয়ার এলে সাঁতার কেটে মূল ভূ-খণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের কখনও নৌকায় চড়ে, অথবা বই-খাতা হাতে নিয়ে সাঁতরে পারাপার হতে  হয়। স্বাভাবিকের চেয়ে নদীর পানি একটু বাড়লেই তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়ে।

কালাবগি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলের বাসিন্দা হারুন সানা বলেন, ‘এখানে বেঁচে থাকা এখন দায় হয়ে উঠেছে।’ গৃহবধূ আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘হয় সৃষ্টিকর্তা আমাগের তুলে নিয়ে যাক, না হয় আমরা এদেশ ছাইড়ে অন্য কোনও জাগায় চলে যাবো, আর সহ্য হয় না।’

দাকোপ উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ আবুল হোসেন বলেন, ‘সাধারণ বাঁধ শিপসা নদীর ভাঙন থেকে ওই অঞ্চলকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে উপযুক্ত বাঁধ নির্মাণের কাজ করছে। আশা করছি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দুর্যোগ ঝুঁকি অনেকাংশে কেটে যাবে।’

তিনি জানান, কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী, উত্তর বেদকাশী, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের পাউবোর বেড়িবাঁধের ওপরেও কয়েকশ’ মানুষ সেই থেকে ঝুপড়িঘর বেঁধে বসবাস করছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে শত কষ্টের মধ্যে দিয়ে বেড়িবাঁধকে আঁকড়ে রেখেছে তারা। আইলার পর ৯ বছর অতিবাহিত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধগুলো এখনও সংস্কার হয়নি। সামান্য ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে এ জনপদের কয়েক লাখ মানুষকে। এ মুহূর্তে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দুটি পোল্ডারে কমপক্ষে ২১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুকিপূর্ণ রয়েছে। বাঁধের ঝুকিপূর্ণ স্থানগুলো হলো—মহারাজপুর ইউনিয়নের লোকা, পূর্ব মঠবাড়ি, দশাহালিয়া, কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা, গুড়িয়াবাড়ি স্লুইসগেট এলাকা, চার নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বানিয়াখালী, হড্ডা খেয়াঘাট এলাকা, তেঁতুলতলার চর ট্রলার ঘাট এলাকা, উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের গাতিরঘেরি, কাশিরহাট ও গাববুনিয়া এলাকা এবং দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের চরামুখা, মাটিয়াভাঙ্গা, জোড়শিং ও ছোট আংটিহারা এলাকা। এরমধ্যে ১৩-১৪/২ নম্বর পোল্ডারে লোকা ও পূর্ব মঠবাড়ি এলাকায় সাড়ে তিন কিলেমিটার এবং ১৪/১ নম্বর পোল্ডারে চার নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট, গোবরা, ঘাটাখালী, গুড়িয়াবাড়ি স্লুইসগেটের পূর্বপাশে, জোড়শিং চরামুখা, মাটিয়াভাঙ্গা ও ছোট আংটিহারা এলাকার সাত কিলোমিটার বাঁধ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।

দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামসুর রহমান জানান, কয়েকদিন আগে তার ইউনিয়নের জোড়শিং বাজারের বেড়িবাঁধ ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়ে। সেই থেকে ওই এলাকার মানুষ এখনও নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বাঁধরক্ষায় কাজ করা হলেও পাউবো কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।  

পাউবোর আমাদী সেকশন অফিসার মসিউল আবেদিন বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কারের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’ কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিমুল কুমার সাহা বলেন, ‘বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানিসহ যেসব সমস্যা আছে, তা সমাধানের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

উপজেলা চেয়ারম্যান আ.খ.ম. তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘নদীভাঙন বা বেড়িবাঁধগুলো স্থায়ীভাবে সংস্কার করার জন্য ইতোপূর্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।

 

/আরএ/এপিএইচ/চেক-এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম