বরগুনা জেলায় রয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার একরের সুবিস্তৃত বনভূমি। কিন্তু, এর বড় অংশই এখন বনদস্যুদের দৌরাত্ম্যে উজাড়ের মুখে। তারা যখন তখন কেটে নিয়ে যাচ্ছে বনের গাছ। বিশাল এই বনভূমি রক্ষায় আছেন বন বিভাগের মাত্র ৯৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলে জনবল সংকটের কারণে চেষ্টা করেও তাদের থামাতে পারছে না বন বিভাগ।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বরগুনার পাথরঘাটার হরিণঘাটা বনের ভেতর থেকে রাতের অন্ধকারে বড় বড় গাছ কেটে নিয়েছে কাঠ চোরাকারবারিরা। বনের ভেতরে দেখা গেছে, অসংখ্য কাটা গাছের গোড়া। কবে, কখন কে বা কারা এসব গাছ কেটেছে তা জানে না বন বিভাগ। এদের কাউকে আইনের আওতায় আনতেও পারছে না সরকারি সংস্থাটি। একই অবস্থা, বরগুনার নলটোনা ইউনিয়নের রাস্তার দু’পাশে লাগানো সবুজ বেষ্টনীর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাথরঘাটা উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৯ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র ২৮ জন বন কর্মকর্তা ও প্রহরী। অল্প জনবল দিয়ে এই বিশাল বনভূমি রক্ষা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বনবিভাগকে।
স্থানীয়রা বলছেন,রাতের আঁধারে চোরাকারবারিরা ট্রলার নিয়ে এসে গাছ কেটে রাতেই নদী পথে চলে যায়। একইসঙ্গে পাথরঘাটা উপজেলার বন বিভাগের বনগুলো সুন্দরবন সংলগ্ন হওয়ায় একটি চক্র হরিণ শিকার এবং সুন্দরী গাছ কেটে নিয়ে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন,পাথরঘাটায় ২৪ ঘণ্টা টহলের ব্যবস্থা করা দরকার। এখানে দক্ষ কর্মকতা ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া এবং জনবল বাড়ানো দরকার। না হলে হরিণ শিকারি ও চোরাকারবারিদের থামানো সম্ভব হবে না।
বরগুনার তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনের আয়তন প্রায় ১৪ হাজার একর। এখানে কোনও একসময় ১২-১৪ জন বনকর্মী ছিলেন। এখন সেখানে আছেন মাত্র ৮ জন। দর্শনার্থীদের জন্য কাউন্টারে একজন থাকতে হয়। এছাড়াও এই বনরক্ষায় নেই কোনও নৌযান। এতবড় বনভূমিতে রয়েছে ছোট বড় অসংখ্য খাল। কখনও কখনও সাঁতরে এগুলো পার হতে হয় বন কর্মীদের। এ সুযোগ ব্যবহার করছে গাছ চোরাকারবারিরা।
টেংরাগিরি বনের দক্ষিণ প্রান্তে সাগর। সেই সাগর তীরে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য বড় বড় গাছের কাটা গোড়া । এসব কাটা গোড়াগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে কিছুদিন আগেও এখানে রেইন ট্রি, আকাশমনি, আকাশিসহ বিভিন্ন গাছ দাঁড়িয়েছিল। নজরদারির অভাবে এগুলো কেটে নিয়ে গেছে বনদস্যুরা। বনের ভেতর থেকেও গাছ কাটছে তারা।
টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনের বিট কর্মকর্তা জাহিদ প্রামাণিক বলেন, ‘টেংরাগিরি অনেক বড় বন। আর আমাদের এখানে জনবল খুবই কম। তবে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি যাতে বন থেকে গাছ চুরি না হয়। এর মধ্যে কয়েক স্থানে গাছ কাটার সংবাদ পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। আমরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় গাছ চুরি রোধে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। আমাদের লোকবল কমের কারণে এতবড় বনভূমি রক্ষায় কষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় প্রতিটি স্থানে সঠিক সময় টহল দিতে পারছে না বনরক্ষীরা। চোরাকারবারিরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বনের ভেতর থেকে কেটে নিচ্ছে তাদের পছন্দ মতো গাছ। একইসঙ্গে সৃজিত বনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকার প্রভাবশালীরা গাছের ডালসহ গাছ কেটে নিচ্ছে লোক চক্ষুর আড়ালে।’
এদিকে, বরগুনার নিশানবাড়ীয়া বেড়িবাঁধের ওপরে লাগানো রেইনট্রিসহ বিভিন্ন গাছের ডাল ও গাছ কেটে নিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। প্রকাশ্যে লোক দিয়ে রাস্তার পাশের গাছের ডাল ও গাছ কেটে নেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে কৌশলে প্রভাবশালীরা স্থান ত্যাগ করেন। শ্রমিকরা জানান, গাছ কাটার জন্য মজুর হিসেবে নিয়েছে তাদের। আমরা দু’মুঠো ভাতের জন্য কাজ করি। প্রভাবশালীদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘আপনাদের কাছে তাদের নাম বললে পরে আমাদের ওপরে অত্যাচার হবে।’
বরগুনা বনবিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (রেঞ্জ অফিসার) মতিয়ার রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বরগুনা সদরে যে পরিমাণ জনবল থাকার কথা তা না থাকায় মাঝে মাঝে দু-এক স্থান থেকে কিছু লোক গাছের ডালপালা কাটে। যেখানে ডাল বা গাছ কাটার সংবাদ পাই সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ছুটে যাই এবং আইনগত ব্যবস্থা নেই। তবে জনবল বৃদ্ধি হলে এই সমস্যাও থাকবে না।’
এ বিষয়ে বন বিভাগের পটুয়াখালী ও বরগুনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এরিয়ার মধ্যে বনদস্যুরা গাছ কাটার খবর পেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেই্। এছাড়া নদী পথে সুন্দরবন বা অন্য কোনও বন থেকে যে গাছ পাচার হয় তা পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সহযোগিতায় আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। বন থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটার বিরুদ্ধে আমরা সবসময় তৎপর রয়েছি।’








