৩২ কিলোমিটার ‘মৃত্যুফাঁদ’

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা
২৭ জুন ২০১৮, ১৩:১৭আপডেট : ২৭ জুন ২০১৮, ১৩:৩৮

গত ২৩ জুন গাইবান্ধায় দুর্ঘটনাকবলিত বাস (ছবি: ফোকাস বাংলা) গাইবান্ধায় রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের ৩২ কিলোমিটার এলাকার চিহ্নিত কয়েকটি পয়েন্টে আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে গেছে সড়ক দুর্ঘটনা। গত ছয় মাসে এই এলাকায় পৃথকভাবে ৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ। আহত হয়েছেন আড়াই শতাধিক মানুষ। রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের বগুড়ার শেষ সীমানা গোবিন্দগঞ্জের চাপড়িগঞ্জ থেকে সাদুল্যাপুর উপজেলার  ধাপেরহাট পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার মহাসড়কে একের পর এক দুর্ঘটনায় পরিবহন শ্রমিক, যাত্রী সাধারণ ও এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়া, দুর্ঘটনা রোধে চিহ্নিত ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোয় সতর্কতার ব্যবস্থা না নেওয়া এবং যেখানে সেখানে যাত্রী উঠানামাসহ যানবাহনের বেপোরোয়া আচরণের কারণেই এসব স্থানে দুর্ঘটনা বেড়ে চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কের বেহাল অবস্থার সঙ্গে নির্মাণত্রুটি, পর্যাপ্ত স্পিডব্রেকার না থাকা, অদক্ষ চালক দিয়ে যানবাহন চালানো, ফিটনেস বিহীন গাড়ি, অবৈধ যান চলাচল, ওভারটেকিং, ওভারস্পিড, ট্রাফিক আইন না মানা, নেশাগ্রস্ত ও ঘুমঘুমভাবে চালকদের যানবাহন চালানোর কারণেই মূলত এসব দুর্ঘটনা ঘটছে।

গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানা ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের ৩২ কিলোমিটার এলাকায় ৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪২ জন। শুধু ২৩ জুন ভোরেই পলাশবাড়ীর মহেশপুর (বাঁশহাটি) এলাকায় বাস দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হন। এসব দুর্ঘটনায় পলাশবাড়ী ও গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে অর্ধশতাধিক। দুর্ঘটনায় হতাহতের কেউ বাদী না হওয়ায় অধিকাংশ মামলায় পুলিশ বাদী

এর আগে উল্লেখ্যযোগ্য সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ৬ জুন ও ১ মে গোবিন্দগঞ্জের বোয়ালী এবং পলাশবাড়ীর জুনদহে বাসের ধাক্কায় তিনজন, ১০ মার্চ সকালে পলাশবাড়ীর দক্ষিণ বাসস্ট্যান্ডে বাসের ধাক্কায় দাঁড়িয়ে থাকা শ্যালোইঞ্জিন চালিত ভটভটির চার শ্রমিক ও দুপুরে জুনদহে বাস খাদে পড়ে পড়ে সাতজন নিহত হন। ২৮ মার্চ পলাশবাড়ীর রাব্বী মোড়ে বাসের থাক্কায় এক পথচারী, ২২ এপ্রিল গোবিন্দগঞ্জে বকচরে বাস উল্টে মুসল্লিসহ চারজন, ২৬ ও ৩০ জানুয়ারি গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ীতে বাসের ধাক্কায় তিন পথচারী নিহত হন। এছাড়া প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটলেও গত ১৪ এপ্রিল পলাশবাড়ীর ড্রিমল্যান্ড এলাকায় চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে বাস উল্টে খাদে পড়ে অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। গত ২৩ জুন গাইবান্ধায় দুর্ঘটনাকবলিত বাস (ছবি: ফোকাস বাংলা)

গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকতারুজ্জামান জানান, ‘মহাসড়কে সংষ্কার, নির্মাণ ক্রটি, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্পিড ব্রেকার না থাকা, মহাসড়কের দুই পাশে ফুটপাতের পরিমাণ কম থাকায় দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। এছাড়া অধিকাংশ দুর্ঘটনাই গভীর রাতে ঘটছে। মহাসড়কে চলাচলকারী নৈশ  কোচের একজন চালকের দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানো, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানোর কারণে ভোর ও সকালের দিকে তারা ঘুমিয়ে পড়লে বা ক্লান্ত হয়ে গেলে দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া ট্রাফিক আইন না মানা, অদক্ষ চালকের বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেক, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, যান্ত্রিক ক্রটি থাকা, অতিরিক্ত যাত্রী উঠানো এবং যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী উঠানামার কারণেও দুর্ঘটনা বাড়ছে। পাশাপাশি মহাসড়কে বেশি পরিমাণ বাঁক (মোড়) থাকায় তা দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করলে দুর্ঘটনার পরিমাণ অনেক কমবে।’

গোবিন্দগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমত সড়ক দুর্ঘটনার কারণ সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার পাশাপাশি দক্ষ চালক-হেলপার, ক্রটিমুক্ত যানবাহন চলাচলে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। সর্বোপরি যাত্রী সাধারণকে সচেতন হতে হবে। এছাড়া  সড়ক দুর্ঘটনায় প্রকৃত দোষী চালকদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই মহাসড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক কমে যাবে।’

পলাশবাড়ী উপজলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক ও শ্রমিক নেতা গোলাম সারওয়ার প্রধান বিপ্লব বলেন, ‘রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলে প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় শত শত মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হলেও দুর্ঘটনা রোধে নেই যুগোপযোগী আইন ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ। সড়ক দুর্ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও প্রচলিত আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধ করেও পার পাচ্ছেন তারা। দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন ব্যবস্থার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নজরদারি বাড়াতে হবে। যাতে সড়ক-মহাসড়কে অবৈধ-ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করতে না পারে। এছাড়া উন্নত সড়ক, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক মেরামত করাসহ দক্ষ চালক ও প্রয়োজনে একের অধিক চালক রাখতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনা অনেক কমবে।’

গাইবান্ধা সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের গাইবান্ধা জেলার ৩২ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা বর্তমানে অনেক ভালো। সড়কের কোথাও কোন খানাখন্দ নেই। এ মহাসড়কের বেশ কয়েকটি জায়গায় বাঁক (মোড়) রয়েছে। এসব বাঁকে সচেতনতায় নির্দেশনা দেওয়া আছে। তবে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রথমত ক্রটিমুক্ত যানবাহন চলাচল আর দক্ষ চালক দিয়ে যানবাহন চলানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়লে দুর্ঘটনার পরিমাণ কমবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সড়ক মন্ত্রণালয়, হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে নজরদারি বাড়াতে হবে।’

আরও পড়ুন- পদ্মায় ঢেউয়ের আঘাতে স্পিডবোট ডুবি, নৌ চলাচল বন্ধ

/এফএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম