রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)-এর গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে ১১ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা করে তাদের এ নিয়োগ দেওয়া হয়। এমনকি নিয়োগ পাওয়ার আগেই এসব শিক্ষকের সঙ্গে ছবি তুলে নিজের ফেসবুক পেজে আপলোড করার অভিযোগ উঠেছে উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহর বিরুদ্ধে। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ছবিতে বিশ্ববিদ্যালয়টি রেজিস্ট্রার ইবরাহিম কবীর ও শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমানকেও দেখা গেছে।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এ ব্যাপারে কয়েকজন শিক্ষক জানান, শিক্ষক নিয়োগে কাকে নেওয়া হবে তা সিন্ডিকেট সভায় চূড়ান্ত হয়। কিন্তু ১১ জন শিক্ষককে নিয়ে সিন্ডিকেট সভার আগেই ছবি তুলে উপাচার্যের ফেসবুকে আপলোড দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাদের নিয়োগ উনি আগেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। এছাড়াও এই নিয়োগ নিয়ে ৩ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ইবরাহিম কবীরের দাবি, শিক্ষকদের নিয়োগপত্র দেওয়ার পর ছবি তোলা হয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, ছবির পেছনে সিন্ডিকেট সভার ব্যানার রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগে ১১ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। এতে ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বাবিদ্যালয়ের মতো দেশের প্রথম সারির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার পর ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার পর নাম ঘোষণা করা হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করার চেষ্টা করা হয় কিন্তু এতে পছন্দের প্রার্থীদের ব্যাপারে বাধা আসতে পারে ভেবে কঠোর গোপীনয়তার মধ্য দিয়ে ২৩ জুন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের লিঁয়াজো অফিসে সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করা হয়। সভায় সিন্ডিকেট সদস্য রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কাজী হাসান আহাম্মেদ ও দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন সদস্য অনুপস্থিত থাকলেও ওই সভায় উপাচার্য ১১ জন শিক্ষকের নিয়োগ অনুমোদন করিয়ে নেন। এদের মধ্যে উপাচার্যের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার ভায়রাও রয়েছেন।
আরও জানা যায়, এদিকে সিন্ডিকেট সভার আগেই নিশ্চিত হওয়া ১১ জন শিক্ষক সিন্ডিকেট সভাস্থলে আগের দিন থেকে অবস্থান করতে থাকেন। সিন্ডিকেট সভার আগেই ওই সভার ব্যানারের পেছনে ‘আগে থেকে নিশ্চিত হওয়া ১১ শিক্ষককে’ দাঁড় করিয়ে সামনে উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চেয়ারে বসে ছবি তোলেন। সেই ছবি উপাচার্যের ফেসবুকে দেওয়ায় তা ভাইরাল হয়ে যায়।
জানা যায়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে নিয়োগ পাওয়া ১১ জন শিক্ষকের মধ্যে ঢাকার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আশফারা খাতুনকেও নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়াও উপাচার্যের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার ভায়রাকে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ইবরাহিম কবীর বলেন, ‘১১ জন শিক্ষকের নিয়োগ অনুমোদন করেছে সিন্ডিকেট কমিটি।’ কিন্তু সভার আগে ১১ জনকে নিয়ে ছবি তোলার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছবিটা পরের দিনের।’ তার দাবি, নিয়োগপত্র দেওয়ার পর ছবি তোলা হয়েছে।
এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান বলেন, ‘যদিও আইনগত কোনও বাধা নেই, তারপরও এটা বোধ হয় ঠিক হয়নি।’ সিন্ডিকেট সভার আগে কীভাবে ১১ জন শিক্ষক তাদের নিয়োগের ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন তা জানতে চাইলে তিনি কোনও উত্তর দেননি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপাচার্যের একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জানান, ১১ জনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই চূড়ান্ত ছিল। সে কারণেই তাদের সভার আগেই ডেকে নেওয়া হয়। সভার পরে তারা সবাই একজন শিক্ষক নেতার সঙ্গে একই বিমানে রংপুরে আসেন। এরপর নিয়োগপত্র নিয়ে ওই দিনই তারা ঢাকায় যান। এরপর তারা ওরিয়েনটেশন করেছেন।
এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়, তবে তিনি কোনও মন্তব্য করবেন না বলে জানান।








