লোকসান পিছু ছাড়ছে না মধ্যপাড়া কঠিন শিলাখনির

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
০৬ জুলাই ২০১৮, ০৭:৪৬আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৮, ১০:০৪

মধ্যপাড়া পাথর খনি ক্রমাগত লোকসান থেকে মুক্তি মিলছে না দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলাখনির। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) দাবি, খনি কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে বারবার পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণেই চুক্তি অনুযায়ী পাথর উত্তোলন করা সম্ভব হয় না। এসব অভিযোগ অস্বীকার করে খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এসএম নুরুল আওরঙ্গজেব বলেন, ‘এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। কমিটি সার্বিক বিষয় পরিচালনা করবে। এছাড়া অনেক বিষয় রয়েছে, যা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছাড়া বলা সম্ভব নয়।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসির অভিযোগ, ১০ মাস আগে পেট্রোবাংলা গঠিত একটি তদন্ত কমিটি চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে সুপারিশ করে। কিন্তু খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওই সুপারিশটিকে কোনও গুরুত্ব দিচ্ছে না। এতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খনি কর্তৃপক্ষের দূরত্ব বেড়েই চলেছে।

খনিসূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি ২০০৭ সালের ২৫ মে বাণিজ্যিকভাবে পাথর উত্তোলন শুরু করে। প্রথম অবস্থায় গড়ে দৈনিক ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টন পাথর উত্তোলন হলেও ২০১২ সাল থেকে তা নেমে দাঁড়ায় ৫০০ টনে। এতে পাথর খনিটিতে ৬ বছরে প্রায় দুইশ’ কোটি টাকার লোকসান হয়। এ অবস্থায় পাথর খনির উৎপাদন বৃদ্ধি করতে এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষ বেলারুশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসির সঙ্গে ছয় বছরের জন্য চুক্তি করে। ১৭ কোটি ১৯ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ৬ বছরে ৯২ লাখ টন পাথর উত্তোলনের চুক্তি করা হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন শুরু করে জিটিসি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ অনুযায়ী, পাথর উত্তোলন শুরু করার ছয় মাস পর সেপ্টেম্বর মাসের দিকে চুক্তি মোতাবেক মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক সরবরাহ না করায় ২০১৪ সালে দুই মাস উৎপাদন বন্ধ থাকে। দুই মাস পর আবারও উৎপাদন শুরু হলে ডিসেম্বর মাসের দিকে মাইনিং সরঞ্জাম ও উৎপাদন যন্ত্র সরবরাহ করার চাহিদাপত্র দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্র সরবরাহ না করায় ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৬ সালে বিদেশ থেকে উৎপাদন যন্ত্র আমদানি করে ভূ-গর্ভে নতুন স্টোপ (শিলা উৎপাদন ইউনিট) তৈরি করা হয়। এর পৌনে দুই বছর পর ২০১৭ সালের জুন মাস থেকে আবারও পুরোদমে পাথর উত্তোলন শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে গত ২ জুন আবারও বিস্ফোরকের অভাবে ৮ দিন পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকে।

জিটিসি’র সঙ্গে ছয় বছর পাথর উত্তোলনের চুক্তি থাকলেও ঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক ও যন্ত্রপাতি না পাওয়ায় প্রায় দুই বছর পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকে। ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬ বছরে ৯২ লাখ টন পাথর উত্তোলনের চুক্তি থাকলেও ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত—৪ বছর ২ মাসে পাথর উত্তোলন হয়েছে মাত্র ১৯ লাখ টন। চুক্তি অনুযায়ী, আর মাত্র এক বছর ১০ মাস সময়ের মধ্যে জিটিসিকে পাথর উত্তোলন করতে হবে ৭৩ লাখ টন, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে দাবি করে জিটিসি। এ কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বাড়ানোর জন্য পেট্রোবাংলাকে অনুরোধ করে। ওই অনুরোধের ফলে ২০১৭ সালের ৪ মে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পেট্রোবাংলা পরিচালক (পরিকল্পনা) আমিনুজ্জামানকে আহ্বায়ক ও তৎকালীন বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ খানকে সদস্য সচিব করে ৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে পেট্রোবাংলা। কমিটি ওই বছরের ২৪ আগস্ট পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে আরও ৩০ মাস চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই সুপারিশের আলোকে কোনও পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়নি।

জিটিসি’র হিসাব অনুযায়ী, তারা দৈনিক এই খনি থেকে ৫ হাজার টন পাথর উত্তোলন করে। এতে যে দুই বছর খনি বন্ধ ছিল, ওই সময়ে প্রায় ৩৬ লাখ টন পাথর উত্তোলন করা সম্ভব হতো। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চুক্তি অনুযায়ী পাথর উত্তোলন করা যেতো। কিন্তু খনি কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে এটি সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করেন জিটিসির মহাব্যবস্থাপক জামিল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, চাহিদা অনুযায়ী খনিতে প্রয়োজনীয় মালামাল সরবরাহ করবে খনি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু উৎপাদনে যাওয়ার পর খনি কর্তৃপক্ষের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই চাহিদাপত্র দিয়ে সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। আর নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বিস্ফোরক ও মালামাল না পাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এই কারণেই চুক্তি অনুযায়ী পাথর উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করলে পেট্রোবাংলা একটি কমিটি করে দেয়। ওই কমিটি সুপারিশ পেশ করে।’ কিন্তু পেট্রোবাংলা গঠিত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

জিটিসির এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এসএম নুরুল আওরঙ্গজেব। তিনি বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মালামাল ও যন্ত্রপাতি দেওয়া হয় না, এমন অভিযোগ ঠিক নয়। যে সময় উৎপাদন বন্ধ ছিল, তা চুক্তির মেয়াদে বৃদ্ধি করা হবে কিনা, এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। কমিটি সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করবে। চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর ব্যাপারে এখনও কোনও চিঠি পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত খনিটি লোকসানের মুখেই রয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী পাথর উত্তোলন করা সম্ভব না হলে লোকসানেই থাকবে খনিটি।’ এছাড়া অনেক বিষয় রয়েছে, যা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছাড়া বলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

/ওআর/এমএনএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম