নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ পঞ্চম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন সাইদুর রহমান পায়েল। পড়াশুনায় ছিলেন খুবই মেধাবী। এসএসসি ও এইচএসসি’তে পেয়েছিলেন জিপিএ-৫। অন্য দুই ছেলেমেয়ের চেয়ে তাকে নিয়েই বেশি স্বপ্ন দেখতেন তার কাতারপ্রবাসী বাবা। গোলাম মাওলা ভাবতেন, বিবিএ শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার্থে পায়েলকে দেশের বাইরে পাঠাবেন। উচ্চশিক্ষা শেষে ছেলে দেশে ফিরে তার ইচ্ছেমতো চাকরি বা ব্যবসা করবে। এরপর ছেলের পায়ের নিচে মাটি হলে তিনি তার কাছে চলে আসবেন। গোলাম মাওলার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো। তার ভাষায়, ‘তারা আমার স্বপ্ন পূরণ হতে দিলো না।’
গত ২১ জুলাই রাত ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে দুই বন্ধু মো. মহিউদ্দিন শান্ত (২২) ও হাকিমুর রহমান আদরের (২২) সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো-ব-৯৬৮৭) ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন পায়েল। এরপর গত ২৩ জুলাই সকালে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর খাল থেকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ থানার সরিষপুর গ্রামের বাসিন্দা ও কাতার প্রবাসী গোলাম মাওলার ছেলে সাইদুর রহমান পায়েলের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার পরদিন ২৪ জুলাই হানিফ পরিবহনের ওই বাসের চালক জামাল হোসেন (৩৫), হেলপার ফয়সাল হোসেন (৩০) ও সুপারভাইজার জনিকে (৩৮) গ্রেফতার করা হয়। বুধবার সুপারভাইজার জনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এর আগে মঙ্গলবার (২৪ জুলাই) পায়েলের মামা গোলাম সরওয়ার্দী বিপ্লব বাদী হয়ে গজারিয়া থানায় বাসচালক জামাল, সুপারভাইজার জনি ও হেলপার ফয়সালকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সুপারভাইজার জনি জানায়, ‘রবিবার (২১ জুলাই) দিনগত রাত ৪টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভবেরচর ব্রিজের কাছে যানজটে পড়ে বাস। এ সময় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাস থেকে নিচে নামেন পায়েল। এরমধ্যেই যানজট কিছুটা কমলে বাস এগোতে থাকে। এ সময় পায়েল দৌড়ে এসে বাসে উঠতে গিয়ে নাকেমুখে আঘাত পান। সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যান রাস্তায়। এ পর্যায়ে আহত পায়েলকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার বদলে মৃত ভেবে ভবেরচর ব্রিজ থেকে খালে ফেলে দেয় তারা (বাসচালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারী)।’
গোলাম মাওলা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তাকে (পায়েল) নিয়ে আমি খুব বড় স্বপ্ন দেখেছিলাম। নর্থসাউথ থেকে বিবিএ শেষ করার পর তাকে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে পাঠাবো। ওখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসার পর ও কিছু একটা কাজ করলে তখন আমি একেবারে দেশে ফিরে আসবো। কিন্তু তারা আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি। তারা আমার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলের খুনিদের ফাঁসি চাই।’
দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে পায়েল সবার ছোট ছিলেন। বড় ছেলে গোলাম মোস্তফা পলাশ গোলাম মাওলার সঙ্গেই কাতারে থাকেন। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। পায়েলকে ঘিরেই ছিল তার যত স্বপ্ন।
গোলাম মাওলা বলেন, ‘বড় ছেলে আমার সঙ্গে কাতারে থাকে। সে বিয়ে করেছে। একমাত্র মেয়েকেও বিয়ে দিয়েছি। পায়েলকে ঘিরেই ছিল আমার সব চিন্তা। পায়েল মেধাবী ছিল। সে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাকে উচ্চশিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করবো, এটাই ছিল আমার স্বপ্ন।’
পায়েলের লাশ উদ্ধারের পর গত ২৪ জুলাই কাতার থেকে দেশে ফিরেন গোলাম মাওলা ও তার বড় ছেলে গোলাম মোস্তফা পলাশ। কিন্তু পায়েলের মুখটা থেঁতলে যাওয়ায় তাদের তা দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে বুধবার (২৫ জুলাই) সকাল ৮টার দিকে জানাজা শেষে পায়েলকে দাফন করা হয়।
গোলাম মাওলা বলেন, ‘খুনিরা আমার ছেলেকে এমনভাবে মেরেছে, আমি আমরা ছেলের মুখটা পর্যন্ত দেখতে পারিনি। আমি আমার ছেলের খুনিদের চেহারা দেখতে চাই, তাদের ফাঁসি চাই।’
তিনি বলেন, ‘তারা (বাসচালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারী) বলেছে, তড়িঘড়ি করে বাসে উঠতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে আমার ছেলে পড়ে যায়। পড়ে যেতেই পারে। তাদের উচিত ছিল আমার ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া বা আমাদের ফোনে জানানো। তারা তা করেনি। তারা আমার ছেলেকে ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দিয়েছিল।’
গোলাম মাওলা আরও বলেন, ‘আমার ছেলে যেসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করেছে, তার মৃত্যুর খবর পেয়ে সব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আমাদের সমবেদনা জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত হানিফ পরিবহনের পক্ষ আমাদের সামান্য সহানুভূতিটুকুও জানানো হয়নি। অথচ তাদের স্টাফদের কারণে আমার ছেলের মৃত্যু হয়েছে। আমরা হানিফ পরিবহনের মালিকসহ খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’








