মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলায় সরকারিভাবে দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ জিআর-এর চাল ও চাল বিক্রির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। তবে কারা এই আত্মসাতে জড়িত সেবিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। গত অর্থ বছরের শেষ সময়ে ৩২টি মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব ও এতিমখানার নামে বরাদ্দকৃত চালের অর্ধেকের বেশি উধাও, বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত কেউই এই চালের কী হয়েছে তার সঠিক কোনও উত্তর দিতে পারছেন না। অভিযোগ উঠেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের সরকারিভাবে ৭৮ হাজার টাকা মূল্যের দুই মেট্রিক টন চাল পাওয়ার কথা ছিল, সেসব প্রতিষ্ঠান পেয়েছে মাত্র ১ মেট্রিক টন চাল। আবার কোনও প্রতিষ্ঠান পেয়েছে মাত্র ২০ হাজার টাকা। কোথাও আবার নামসর্বস্ব মসজিদ বা মাদ্রাসার নাম ভাঙিয়ে পুরোটাই আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও গুদাম মালিকদের সিন্ডিকেট এই চাল ও টাকা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সরকারি বরাদ্দের চাল উপজেলা প্রশাসন হয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার হাতে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ডিও’র ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত চাল সরকারি খাদ্যগুদামে পাঠান। ডিও লেটার দেখিয়ে উপকারভোগী এসব প্রতিষ্ঠান গুদাম থেকে চাল নেন অথবা চাল বিক্রি করে টাকা তুলে দিতে পারেন। তবে রাজৈর উপজেলায় এই প্রক্রিয়া অতিক্রম করে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো অর্ধেকেরও কম চাল বা টাকা পেয়েছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদারীপুরের রাজৈর পৌরসভার অন্তর্গত টেকেরহাট বন্দরের লঞ্চঘাট জামে মসজিদের জন্য এবার ঈদের আগে সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি জিআর-এর ২ মেট্রিক টন (২ হাজার কেজি) চাল বরাদ্দ হয়। বর্তমান সরকার নির্ধারিত দরে যার দাম ৭৮ হাজার টাকা। কিন্তু মসজিদ কর্তৃপক্ষ পেয়েছেন মাত্র ২০ হাজার টাকা।
রাজৈরের টেকেরহাট লঞ্চঘাট জামে মসজিদের সভাপতি শামসুল হক জানান, ‘সরকার থেকে ২০ হাজার টাকা পেয়েছি। পুরো চালের দাম পেলে তো ভালোই হতো।’
আমগ্রামের হাওলাদার বাড়ি জামে মসজিদের সভাপতি হাজী মহব্বত আলী হাওলাদার জানান, ‘মসজিদের জন্য ২ টন চাল পেয়েছিলাম। তবে চালের ডিলাররা আমাদের ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে।’
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় এমপি থেকে শুরু করে ইউপি চেয়ারম্যান পর্যন্ত জনপ্রতিনিধিদের কাছের লোক হিসেবে খ্যাত রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং চাল ব্যবসায়ী ডিলারদের সিন্ডিকেট মিলে রাজৈরের সর্বশেষ বরাদ্দকৃত ৩২টি মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রায় সব কটিতেই এমন দুর্নীতি করেছে। তাদের এই চক্রটি প্রায় সব জায়গাতেই চাল না দিয়ে নামমাত্র টাকা দিয়েছে। যারা এই সিন্ডিকেটের কাছে চাল বিক্রি করেনি এবং এতিমদের খাওয়ানোর জন্য সরাসরি খাদ্য গুদাম থেকে চাল উত্তোলন করেছে, তারা আরও বেশি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। যেমন মাদারীপুরের খালিয়া দারুস সুন্নাহ এতিমখানা ও মসজিদ এবং খালিয়া খালপাড় জামে মসজিদ ও মক্তব্য এই চারটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে ২ মেট্রিক টন করে চাল বরাদ্দ হয়। অথচ তারা প্রতিটিতে ১ মেট্রিক টন করে চাল পেয়েছেন।
খালিয়া দারুস সুন্নাহ এতিমখানার শিক্ষা সচিব মাওলানা আবু ইউসুফের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে যে মসজিদে ১ টন ও এতিমখানায় ১ টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু জেলা প্রশাসনের কাগজে দেখলাম যে ২ টন করে বরাদ্দ হয়েছে। এখানে এতিমদের খাওয়ানোর জন্য চাল লাগে। তাই আমরা চাল উত্তোলন করেছি। এখানে যারা থাকে তাদের কারও বাবা নেই, কারও মা নেই, কারও আবার বাবা-মা দু’জনই নেই। অথচ এমন এতিমদের হক যারা মেরে খেয়েছে তাদের বিচার হওয়া উচিত।’
একইভাবে রাজৈরের খালিয়া খালপাড় জামে মসজিদ ও মক্তবের জন্য ২ টন করে ৪ টন চাল বরাদ্দ হয়। তাদেরও দেওয়া হয়েছে অর্ধেক। খালিয়া খালপাড় জামে মসজিদ ও মক্তবের পক্ষ থেকে চাল উত্তোলন কমিটির সদস্য ইয়াকুব মোল্লা বলেন, ‘আমাদের বলেছে আপনাদের জন্য ১ টন করে বরাদ্দ হয়েছে। আমরা সরকারি কাগজে সই দিয়ে এসেছি। এখন সরকারি তালিকায় দেখলাম ২ টন করে বরাদ্দ হয়েছে। বাকিটা আমরা পাইনি।’
কোথাও কোথাও অস্তিত্বহীন মসজিদের নাম ব্যবহার করেও টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যেমন রাজৈরের হরিদাসদী-মহেন্দ্রদী ইউনিয়নের ৩টি মসজিদের নামে ২ টন করে বরাদ্দ হয়েছে। এর মধ্যে ২টি মসজিদে ২০ হাজার পেয়েছে। বাকি একটি মসজিদের কোনও অস্তিত্ব নেই।
দক্ষিণপাড়া হাজীবাড়ি জামে মসজিদের সভাপতি শাহেদ আলী জানান, মসজিদের জন্য জিআর-এর চাল বাবদ ২০ হাজার টাকা পেয়েছেন। ঘোষালকান্দি বাইতুল ফানাহ জামে মসজিদের সভাপতি এমারাত শেখ বলেন, ‘আমাদের মসজিদের জন্য ১৯ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছি।’ নয়াকান্দি ইসমাইল শেখের বাড়ি জামে মসজিদের সদস্য সম্রাট শেখ জানান, ২ টন চাল বরাদ্দ হলেও পেয়েছেন ২০ হাজার টাকা।
চাল বিতরণের দায়িত্বে থাকা রাজৈরের টেকেরহাট খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা (ওসি-এলএসডি) কামরুল হাসান জানান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার ডিও’র ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত চাল দেওয়া হয়। তবে তিনি সরাসরি এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে দিয়েছেন, নাকি সিন্ডিকেট চক্রের হাতে দিয়েছেন এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা ডিও লেটার নিয়ে এসেছেন তাদের চাল দেওয়া হয়েছে। তবে এতে সিন্ডিকেট চক্রের হাত থাকতে পারে।
জেলা প্রশাসনে ত্রাণ শাখা থেকে উপজেলা পরিষদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার মাধ্যমে এই চাল সরাসরি সংশ্লিস্ট প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বরাবর বরাদ্দ হলেও তাদের হাতে পৌঁছে না। খাদ্যগুদাম থেকে উত্তোলনের আগেই সিন্ডিকেটের কাছে জিআরের চাল স্বল্প মূল্যে বিক্রি হয়ে যাওয়ার ঘটনা তদারকি করতে পারছেন না সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা।
রাজৈর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এইচএম মাহবুব হোসেন বলেন, ‘জুন মাসের একেবারে শেষের দিকে এসে এই বরাদ্দ হয়। তখন এত ঝামেলা ছিল কাজের, ছিল জনবল সংকট। এতগুলো মসজিদে জিআর-এর চাল বিলির ব্যাপারে আমরা হয়তো পর্যাপ্ত তদারকি করতে পারিনি। তবে আমাদের কাছে কোনও লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগে এলে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।’
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দালালচক্রের কারণে এই ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে বরাদ্দ চালের ব্যাপারে জানতে পেরে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসা থেকে সংশ্লিষ্টরা এসে ভীড় করছেন রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে। ৩২টি মসজিদ, মাদ্রাসার অনেকগুলো কাগজপত্রে স্বাক্ষর করলেও প্রায় অর্ধেকেরও বেশি এখন পর্যন্ত কোনও চাল বা টাকাও পায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে দাবী করে বরাদ্দকৃত পুরো চাল বা চালের অর্থ ফেরত চাইছেন।








