মৌলভীবাজারে সড়ক-মহাসড়কের পাশের গাছে গাছে পেরেক ঠুকে লাগানো হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের বিজ্ঞাপন। এতে সড়কের গাছগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মরে গেছে অনেক গাছ।
মৌলভীবাজারের বেরিরচর, শাহ মোস্তাফা সড়ক, মুননদী ব্রিজ, বাসস্ট্যান্ড, সরকারি কলেজ, বিটিআরআই চা-বাগান এলাকা, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, রেলস্টেশন সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশের গাছে গাছে ঝুলছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত ব্যানার-ফেস্টুন। এসব ফেস্টুন পেরেক দিয়ে গাছে আটকানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের ফেস্টুন, বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসকদের ফেস্টুন। একইভাবে টাঙানো হয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনও।
শ্রীমঙ্গল জালালিয়া রোডের বাসিন্দা ও লেবু বাগান ব্যবসায়ী মো. শাহেদ আহমদ বলেন, ‘সড়কের পাশের প্রতিটি গাছে পেরেক মেরে ১৫-২০টি বোর্ড টাঙানো হয়েছে। নির্বিচারে পেরেক লাগানোর কারণে সড়কের শতাধিক গাছ মরে গেছে। পেরেক মারা বন্ধ না হলে আরও অনেক গাছ মরবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসার ড. মো. জসিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘গাছের পরিবহন সিস্টেম দু’টি। একটি হলো জাইলেম আর আরেকটি হলো ফ্লোয়েম। পানির সঙ্গে দ্রবীভূত খনিজ লবণও জাইলেম টিস্যুর মাধ্যমে উপরে প্রবাহিত হয়। আবার গাছের পাতা থেকে যে খাদ্য তৈরি হয়, সেটা আবার গাছের ছাল দিয়ে ভেতরে যায়। ছালের নিচে ফ্লোয়েম রয়েছে। পাতা থেকে সেটা গাছের নিচের দিকে আসে। এখন যদি কোনও ধরনের পেরেক মারা হয়, তাহলে ফ্লোয়েম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে পাতায় উৎপাদিত খাদ্য রুটে যেতে পারে না। আর যদি বড় পেরেক মারা হয়, তবে পানি, খনিজ লবণের পরিবহন বাধা পায়। এতে গাছ প্রয়োজনীয় পানি ও খনিজ লবণ পায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গাছে পেরেক লাগানোর কারণে গাছের গায়ে যে ছিদ্র হয় তা দিয়ে পানি ও এর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অণুজীব ঢোকে। এতে গাছের ওই জায়গায় পচন ধরে। ফলে গাছের খাদ্য ও পানিশোষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। একসময় গাছটি মরে যায়।’
মৌলভীবাজার মোকামবাজার এলাকার বিসিক শিল্পনগরীর কাছে একটি বড় গাছে কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন টাঙাচ্ছিলেন দুই যুবক। তাদের একজন কুদ্দুছ মিয়া। তিনি বলেন, ‘কোচিং সেন্টারের লোকজন এমন জায়গায় লাগাতে বলেছেন, যেখানে মানুষের চোখ পড়বে। এ জন্য গাছে লাগাচ্ছি।’
গাছে এভাবে পেরেক লাগানো উচিত কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ওই যুবক বলেন, ‘মনে হয় লাগানো ঠিক না। সবাই লাগিয়েছে দেখে আমরাও লাগিয়েছি।’
কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল বনবিটের বিট অফিসার মো. আহমদ আলী গত ৮ সেপ্টেম্বর ৯টা ৫৮ মিনিটে তার ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘এই গাছটির কি অপরাধ? প্রচারণা এই গাছে লোহা মেরে কেন।’
বনবিভাগ সূত্র জানায়, প্রাণিকুলের বেঁচে থাকার প্রধান উপাদান গাছ। এই গাছের যে প্রাণ আছে, অনুভূতিশক্তি আছে, তা প্রমাণিত। সম্প্রতি মন্ত্রাণালয় থেকে বিজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল গাছে পেরেক মারা যাবে না। লাউয়াছড়া বনের আশপাশের গাছগুলোতে পেরেক মেরে লাগানো বিজ্ঞাপন-ফেস্টুন সম্প্রতি বন বিভাগ খুলে ফেলে দেয় বলেও জানায় এ সূত্র।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ২-৩ দিন হয়েছে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেছি। গাছে পেরেক মারা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি আমি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবো।’
মৌলভীবাজার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. তোফায়েল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাছে পেরেক মেরে বিজ্ঞাপন টাঙানো বন্ধ করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’








