নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে নির্যাতন ও চাঁদা দাবির অভিযোগে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর সপরিবারে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম স্বপন। তার অভিযোগ, মামলা করার পর থেকেই ওসি তার বাড়িতে অপরিচিত লোকজন পাঠিয়ে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়াসহ মামলার ভয় দেখাচ্ছেন। এ অবস্থায় নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর আবেদন করেছেন তিনি।
ব্যবসায়ী স্বপনের দাবি, গত ৭ অক্টোবর রাতে তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে থানায় আটকে রেখে নির্যাতন করে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে তার কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। এ অভিযোগে তিনি গত বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোরশেদ আলম ও উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাধন চন্দ্র বসাকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
থানায় আটকে রেখে জাহিদুলকে মারধরের একটি অডিওক্লিপ বাংলা টিবিউনের হাতে এসেছে। ১৮ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের ওই অডিও রেকর্ডে ব্যবসায়ী জাহিদুলসহ তার আত্মীয়কে বাসা থেকে ধরে আনা থেকে শুরু করে এসআই সাধন বসাকের ওসির সঙ্গে মোবাইলে কথা বলা ও দিকনির্দেশনা নেওয়ার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। থানায় নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধরের বিষয়টিও পরিষ্কার বোঝা যায়। এ সময় ওসি মোরশেদ আলমকে বলতে শোনা যায়, ‘তোকে এখন কে বাঁচাবে!’ মারের আঘাতে ব্যবসায়ী জাহিদুলকে ‘মাগো, মাগো’ বলে চিৎকার করতে শোনা যায় অডিওতে।
একপর্যায়ে জাহিদুলের আত্মীয় আনিছুর রহমানকে থানার জেলাখানায় ঢোকানোর সময় তার দেহ তল্লাশি করে মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। মোবাইলটি পান একজন কনস্টেবল। তিনি পুলিশের একজন কর্মকর্তাকে বিষয়টি বলার পর ওই কর্মকর্তা তাকে সেটি নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। ওই সময় পর্যন্ত থানার ভেতরে যা ঘটেছে তার সবই রেকর্ড আছে ওই অডিওক্লিপে।
জাহিদুলের দাবি, তার আত্মীয়কে হাজতখানায় ঢুকিয়ে দেওয়ার পর ওসি তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে কাঠের রোল দিয়ে বেধড়ক পেটান। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ অবস্থায় তাকে সোনারগাঁ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার জ্ঞান ফিরে আসার পর পুনরায় তাকে থানায় নিয়ে এসআই সাধন বসাক লাঠি দিয়ে পেটান। পরের দিন বিকেল ৪টায় সোনারগাঁ উপজেলা যুবলীগের সভাপতির জিম্মায় সাদা কাগজে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার দত্তপাড়া এলাকায় প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের দেড় একর জমি নিয়ে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে ব্যবসায়ী জাহিদুলের বিরোধ চলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওসি মোরশেদ আলম ও এসআই সাধন বসাক ওই শিল্প মালিকের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে গত ৭ অক্টোবর রাতে ওই বিরোধপূর্ণ জমির ঘর থেকে তাকেসহ তিনজনকে ধরে নিয়ে যায় বলে জাহিদুলের দাবি।
গত ১১ অক্টোবর জাহিদুল বাদী হয়ে ওসি মোরশেদ আলম ও এসআই সাধন চন্দ্র বসাককে আসামি করে নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অশোক কুমার দত্তের আদলতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে এএসপি পদমর্যাদার নিচে নন—এমন কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এসপিকে নির্দেশ দেন।
জাহিদুল জানান, ওসি ও এসআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করার পর থেকে তার মোগড়াপাড়ার বাড়িতে অপরিচিত লোকজন পাঠিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নানাভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। মামলা তুলে না নিলে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যা ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘থানায় ধরে নিয়ে আমাকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, এ কারণে আমি শঙ্কিত! তাই নিজের পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গত রবিবার আইজিপি, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত আবেদন করেছি।’
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, আদালতের আদেশের কপি তাদের কাছে এসে এখনও পৌঁছায়নি। আদালত যেভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সেই আলোকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ী জীবনের নিরাপত্তার কোনও আবেদন আমাদের কাছে করেনি। এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’
ওসি মোরশেদ আলম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘যারা থানার ওসির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন তাদের ভয়ভীতি দেখাবো আমি?’ ভয়ে জাহিদুলের পরিবার-পরিজন নিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর অভিযোগও মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে ওসি মোরশেদ আলম ও এসআই সাধন চন্দ্র বসাকের বিরুদ্ধে দায়ের মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে সোনারগাঁ উপজেলা কমিনিউটি পুলিশ।
গতকাল রবিবার সকালে উপজেলার উদ্বমগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কার্যালয়ে সোনারগাঁ উপজেলা শাখা কমিউনিটি পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তরা বলেন, ওসি মোরশেদ আলম ও এসআই সাধন চন্দ্র বসাক অত্যন্ত নম্রভদ্র ও শান্ত প্রকৃতির লোক। তারা দীর্ঘদিন ধরে সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। তারা এ থানায় যোগ দেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।








