স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর ঘটনা ধাপাচাপা দেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

কুমিল্লা প্রতিনিধি
২৬ অক্টোবর ২০১৮, ১০:২২আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৮, ১০:২৭

কুমিল্লা কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মজির আহমদের বিরুদ্ধে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে দিনভর আটক রেখে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা মিলেছে বলে জানান লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনোজ কুমার দে। ধর্ষণের পর মজির আহমদ গত এক সপ্তাহ বিভিন্নভাবে ওই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও জানায় পুলিশ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মজির আহমদ ও ধর্ষণে প্রত্যক্ষ সহযোগিতার অভিযোগে অপর এক নারীর বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে।

লাকসাম থানা পুলিশ বাদী হয়ে গত বুধবার রাতে এই মামলা দায়ের করে। মজির আহমদ প্রভাতী ইনুসরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান, লাকসাম পৌরসভার সাবেক মেয়র, ভাইয়া গ্রুপের পরিচালক, ভাইয়া অটো রাইস মিলের মালিক ও লাকসাম জেনারেল হাসপাতালের চেয়ারম্যান।

মামলা সূত্রে জানা যায়, লালমাই উপজেলার পেরুল ইউনিয়নের কনকশ্রী গ্রামের গোলাপ হোসেনের ছেলে আফজাল হোসেনের ভাগ্নি সাথী আক্তার (২২)। তার বাড়ি লাকসাম পৌর এলাকার ডুরিয়া বিষ্ণপুর গ্রামে। ঘটনার প্রায় ১০/১২ দিন আগে সে মামার বাড়ি (ধধর্ষণের শিকার কিশোরীর পাশের বাড়ি) বেড়াতে আসে। গত ১৭ অক্টোবর দুপুরে সাথী ওই কিশোরীকে জামা-কাপড় কেনার কথা বলে ফুসলিয়ে লাকসাম নিয়ে যায়। লাকসাম স্টেডিয়ামের পাশে অভিযুক্ত বিএনপির সাবেক নেতা মজির আহমদের পরিচালিত একটি অটো রাইসমিলের অফিস কাম বিশ্রাম কক্ষে নিয়ে যায় মেয়েটিকে। পরে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে সাথী ওই কিশোরীকে নিয়ে আবার বাড়ি ফিরে যায় এবং তাকে বাড়ির পেছনের একটি জায়গায় রেখে সরে যায়। কিছুক্ষণ পর ওই কিশোরী হঠাৎ চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করলে তার মা ও বাড়ির আশপাশের লোকজন এসে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে।

এ সময় ওই কিশোরী মজির আহমদের বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণের অভিযোগ আনে। এছাড়া আফজাল হোসেনের ভাগ্নি সাথী আক্তারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তার ওপর এমন পৈচাশিক নির্যাতনের বিস্তারিত ঘটনা তার স্বজনদের কাছে জানায়।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ঘটনা জানতে পেরে ওই কিশোরীর স্বজনেরা সাথীর মামা আফজাল হোসেনকে ঘটনা জানালে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু সমাধানের আশ্বাস দিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় লাকসাম জেনারেল হাসপাতাল ভর্তি করেন। এ হাসপাতোলের চেয়ারম্যান অভিযুক্ত ধর্ষক মজির আহমেদ। এদিকে ওই কিশোরীর অবস্থার অবনতি হলে তাকে গত শুক্রবার (১৯ অক্টোবর) কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (কুমেক) ভর্তি করেন। পরদিন আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুমিল্লা থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। তবে বর্তমানে ওই কিশোরী বা তার পরিবার কোথায় আছে কেউ বলতে পারছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে লাকসামের একাধিক ব্যক্তি জানান, সাবেক ওই জনপ্রতিনিধি ও বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে এর আগেও এমন একাধিক ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তিনি প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায়নি।

মামলার এজাহারে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করা হয়, ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে গত শুক্রবার সকালে ভাইয়া গ্রুপের মোস্তফা কামাল, পেরুল দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম, পেরুল দক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান ডালিম, ইউপি মেম্বার সাইদুল তিতু ও ধর্ষিতা ছাত্রীর পরিবারসহ স্বজনরা গোপনীয়ভাবে এক সমঝোতা বৈঠকে বসে। সেখানে ছাত্রীর পরিবারকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাইয়া গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মেয়ের পরিবারকে ম্যানেজ করতে মজিরের কাছ থেকে নগদ ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন মোস্তফা সাহেব। কিন্তু পেরুলের চেয়ারম্যান সফিক, মেম্বার তিতু ও আওয়ামী লীগ নেতা ডালিমের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি সিদ্ধান্ত পরির্বতন করে মেয়ের পরিবারকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।’

মেয়ের বাবা বলেন, ‘আমগো মেম্বার বলেছে কাউকে কিছু না বলতে। আমরা ১০ লাখ টাকা চাইছি, কিন্তু তিতু মেম্বার বলেছে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় মেনে যেতে। তবে আমার নাবালিকা মেয়ের জীবন যে নষ্ট করেছে তার বিচার পরকালে হলেও হবে।’

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই বিএনপি নেতা মজির আহমেদ বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগগুলো একেবারে মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। সাথীর সঙ্গে ওই স্কুল ছাত্রী আমার এখানে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন আমি তার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠাই।’

লাকসাম সার্কেল এএসপি নাজমুল হাসান জানান, ‘ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তারা ভিকটিমকে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। পুলিশ সম্ভাব্য সব স্থানে ভিকটিমকে উদ্ধার করার জন্য অভিযান চালায়। ওই ইউপির চেয়ারম্যান, মেম্বার, ভিকটিমের পরিবার বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলছে না। ভিকটিমকে উদ্ধার করা গেলে বিস্তারিত জানা যাবে। ভিকটিমকে উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’

এ ব্যাপারে লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনোজ কুমার দে জানান, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে এবং পুলিশের আভ্যন্তরীণ তদন্তে ঘটনাটি জানার পর লাকসাম থানা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. কামাল হোসেন স্ব-প্রণোদিত হয়ে মজির আহমদ এবং তার সহযোগী সাথী আক্তারের বিরুদ্ধে এই মামলাটি রুজু করেন। এ ঘটনায় এখনও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তবে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

 

/এফএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম