পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের শেখপাড়া গ্রামের নুরানি তালিমুল কোরআন মাদ্রাসার পাঁচ ছাত্রকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। বড়শশী ইউপির সাবেক সদস্য ও একই এলাকার রুহুল আমিন প্রধান ওই শিক্ষার্থীদের ঢাকায় পাঠানোর কথা বলে ও কাউকে না জানিয়ে টিকিট কেটে গোপনে নাইট কোচে তুলে দেন। পরে দেবীগঞ্জ থেকে ওই শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি বোদা ও দেবীগঞ্জ থানায় না জানিয়ে স্থানীয়ভাবে শালিস ডাকেন জনপ্রতিনিধিরা। বৈঠকে ক্ষমা চেয়ে পার পেয়ে যায় রুহুল আমিন। তবে এ ঘটনায় অভিভাবক ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
অপহরণ চেষ্টার শিকার মাদ্রাসা ছাত্ররা হলেন- চিলাহাটি ইউনিয়নের ভুজারিপাড়া গ্রামের আব্দুল খালেকের ছেলে নুরুল হুদা (১৬), একই গ্রামের ইসাহাক আলীর ছেলে সাইফুল ইসলাম শিপন (১৯), একই এলাকার এমদাদুল হকের ছেলে রাসেল (১৬), ফজলুল হকের ছেলে সেলিম হোসেন (১৬) ও বানিয়াপাড়া এলাকার মৃত আনসারুল ইসলামের ফরহাদ হোসেন (১২)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষার্থীকে ঢাকায় ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ও তাদের পরিবার বা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে গত মঙ্গলবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঢাকাগামী নাদের এন্টারপ্রাইজের একটি বাসে গোপনে তুলে দেন রুহুল আমিন। ঢাকার গাবতলী থেকে তার ছেলে হুমায়ুন কবির বাদশা তাদের নিয়ে যাবে বলে জানিয়ে তিনি নেমে পড়েন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ খোঁজাখুঁজি করে এক পর্যায়ে দেবীগঞ্জ কাউন্টার থেকে তাদের উদ্ধার করে।
বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রদের অভিভাবকরা এ বিষয়ে পুলিশের আশ্রয় নিতে চাইলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীরা তাতে বাধা দেন। বড়শশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদস্য মউর রহমান, বড়শশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আফাজ উদ্দিন, আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হোসেন মাস্টার, বড়শশী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম, ইউপি সদস্য জাকির হোসেন পরদিন বুধবার (২৪ অক্টোবর) শালিসে বৈঠক করেন। বৈঠকে রহুল আমিন প্রধান ও তার ছেলে খোকন ইসলাম তাদের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চায়। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নিয়েই তাদের ছেড়ে দেন শালিসকারীরা।
স্থানীয়রা জানান, এর আগেও ওই এলাকা থেকে এক কিশোরকে চাকরি দেওয়ার নাম করে অপহরণ করে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পায় ওই কিশোর। সম্প্রতি জেলার সদর উপজেলার জগদল থেকেও এক মাদ্রাসা ছাত্রকে অপহরণ করা হয়।
অভিভাবক ইসাহাক আলী ও রুবি বেগম বলেন, ঢাকায় নিয়ে গেলে ছেলেদের পাওয়া যেত না। পাচার করে দিতো। তারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। যেন আর কেউ এমন কাজ কোনোদিন করতে না পারে।
বড়শশী শেখপাড়া নুরানি তালিমুল কোরআন মাদ্রাসার মুহতামিম ক্বারী মাওলানা এনামুল হক এনাম বলেন, ‘আমাকে বিপদে ফেলার জন্য কাউকে না জানিয়ে আমার পাঁচ ছাত্রকে অপহরণ করে ঢাকায় পাঠানোর চেষ্টা করেন রহুল আমিন প্রধানসহ তার লোকজন। পরে টের পেয়ে আমরা তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি। স্থানীয়ভাবে যে শালিস হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট না। আমি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’
চিলাহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল মোস্তাহারুল হাসান নয়ন বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের পাঁচ ছাত্রকে অপহরণ করে ঢাকায় পাঠানোর চেষ্টা করে রহুল আমিন প্রধান ও তার লোকজন। এদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। এরা ঢাকায় নিয়ে এদের নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করে দেয় কিংবা তাদের জিম্মি করে টাকা আদায় করে। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। আমি চেয়েছিলাম তাদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীরা শালিসের মাধ্যমে জড়িতদের ছেড়ে দেয়।’
জেলা পরিষদের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মউর রহমান বলেন, ‘বিচারে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ায় রহুল আমিনকে সবাই ক্ষমা করে দেয়। এছাড়া বয়স্ক হওয়ায় তার বিরুদ্ধে অন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
বোদা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এ কে এম নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার পর জেলা পরিষদ সদস্য মউর ইসলাম বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের কথা বলেন। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধান করা হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। তবে আমরা অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো।’








