শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায় জেএসএস, বাঙালিদের দাবি সেনা ক্যাম্প প্রতিস্থাপন

মো. নজরুল ইসলাম (টিটু), বান্দরবান
০১ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:০৯আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:২৪

শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায় জেএসএস, বাঙালিদের দাবি সেনা ক্যাম্প প্রতিস্থাপন পার্বত্য শান্তিচুক্তির একুশ বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল রবিবার (২ ডিসেম্বর)। ১৯৯৭ সালের ওই দিনে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের জন্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এখনও পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি, সংঘর্ষ ও নিপীড়ন বন্ধ হয়নি পুরোপুরি। শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ে শান্তি ফিরবে না বলে দাবি করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, শান্তিচুক্তির ৮০ শতাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। এদিকে যেসব এলাকা থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, তা প্রতিস্থাপন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় এমন স্থানে নতুন নতুন সেনা ক্যাম্প স্থাপন করার দাবি জানিয়েছে পার্বত্য বাঙালি নাগরিক পরিষদ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) নেতাকর্মীদের দাবি, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৭টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে মৌলিক বিষয়গুলোর দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনও বাস্তবায়নই হয়নি। জেএসএস-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের দীর্ঘ একুশ বছরেও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও শান্তিচুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে পার্বত্য সমস্যার সমাধান হয়নি।’
জেএসএস- জানায়, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম (পাহাড়ি) অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য তথা জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব সংরক্ষণ নিশ্চিত হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য প্রযোজ্য আইনসমূহ সংশোধন হয়নি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে বিশেষ শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়নি, তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, পর্যটন, মাধ্যমিক শিক্ষা, উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয় এখনও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তর করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন কার্যকর হয়নি। সেটলার বাঙালি, অস্থানীয় ব্যক্তি ও কোম্পানি, সেনা বাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভূমি বেদখল বন্ধ হয়নি এবং বেদখলের ফলে সৃষ্ট ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিও হয়নি। সব অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান করা সেনা শাসনের অবসান হয়নি। ’
জেএসএস জানিয়েছে, ‘ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুদের নিজেদের জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ করে যথাযথ পুনর্বাসন করা হয়নি, পার্বত্য চট্টগ্রামে সব চাকরিতে পাহাড়িদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়োগ সুনিশ্চিত হয়নি, সেটলার বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা হয়নি। এছাড়া সেনা অভিযান, ঘরবাড়ি তল্লাশি, অবৈধ গ্রেফতার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন, হয়রানি, ক্যাম্প সম্প্রসারণ, সন্ত্রাস, হুমকি অব্যাহত রয়েছে।’
এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বান্দরবান জেলা সভাপ‌তি উ‌ছোমং মারমা বলেন, ‘শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ২৭টি ধারা বাস্তবায়িত হলেও মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সরকার কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে পার্বত্য এলাকায় শোষন, নিপীড়ন, অবিচার, হতাশা, নিরাশা ও হাহাকার চলছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিদিন জুম্ম জাতি তাদের নিজস্ব জমি হারাচ্ছে, প্রতারিত হচ্ছে, অপমানিত ও নিপীড়িত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার ১০ বছরে শুধু ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন বাস্তবায়ন আইনটি সংশোধন হয়েছে। কিন্তু এটি কার্যকর করার জন্য অফিস, লোকবল ও অবকাঠামোর যে বিষয়গুলো দরকার সেগুলোর কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’এভাবে চলতে থাকলে পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি ফিরে আসবে না বলেও জানান তিনি।
তবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি বর্তমান সরকারের বড় একটি সফলতা। কোনও তৃতীয় দেশের সহযোগিতা ছাড়াই নিজের দেশে বসে মাত্র ছয় থেকে সাতবার আলোচনার মধ্য দিয়েই এতো বড় একটি সমস্যা, দুই দশকের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত, রক্তপাতের অবসান ঘটিয়ে সেদিন গেরিলারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছিল। তাদের দাবি, শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। চুক্তির ৮০ শতাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে বলেও দাবি করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লক্ষীপদ দাশ বলেন, ‘এই শান্তিচুক্তি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় সাফল্য। ইতোমধ্যে অধিকাংশ চুক্তিই বাস্তবায়িত হয়েছে। আশা করছি, সরকারের ধারাবাহিকতা, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে আগামীবার শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে।’
তবে এ চুক্তিকে ‘কালোচুক্তি’ আখ্যা দিয়ে পার্বত্য বাঙালি নাগরিক পরিষদের নেতাকর্মীরা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে যে শান্তিচুক্তির কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করা হলে পাহাড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হবে।’ তাদের দাবি, ‘এখন পার্বত্য এলাকা অনেক শান্ত রয়েছে।’ তারা আরও জানান, এখন পর্যন্ত পাহাড়ে যেসব শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে, তার অধিকাংশই সংবিধানবিরোধী। এছাড়া যেসব এলাকা থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, তা প্রতিস্থাপন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় এমন স্থানে নতুন নতুন সেনা ক্যাম্প স্থাপন করার দাবি জানিয়েছে পার্বত্য বাঙালি নাগরিক পরিষদ। তা না হলে পাহাড়ে শান্তি ফিরবে না বলে মনে করে এ সংগঠনটি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙালি নাগরিক পরিষদের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি হচ্ছে কালোচুক্তি। শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়নের পরও পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এখনও বন্ধ হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে যেসব এলাকা থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, সেখানে আবারও তা প্রতিস্থাপন করতে হবে। দুর্গম এলাকায় সেনা ক্যাম্প বাড়াতে হবে। তবেই পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে।’

/এএইচ/ওআর/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম