ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা বিমল রায় চৌধুরী মারা গেছেন

যশোর প্রতিনিধি
১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:৪৩আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:৫৪

ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা বিমল রায় চৌধুরীর মরদেহ

ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বিমল রায় চৌধুরী (৯৪) মারা গেছেন। শনিবার (১৫ ডিসেম্বর) সকাল ৯টায় যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।

প্রয়াত বিমল রায় চৌধুরীর ছেলে অনুপ রায় চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জানা যায়, যশোর সদর উপজেলার রায় চৌধুরী বংশে ১৯২৫ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন বিমল রায় চৌধুরী। তার বাবা সুরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী জমিদার এবং একজন সমাজ সংস্কারক ছিলেন। মাতা অনিলা রায় চৌধুরী একজন প্রগতিশীল নারী, যিনি গ্রামের মহিলাদের উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে সূচ শিল্পের প্রশিক্ষণ দিতেন। বাবা-মায়ের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে সমাজসেবার কাজ করেন বিমল রায় চৌধুরী।

১৯৫২ সালে বিমল রায় চৌধুরী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কেশবপুর উপজেলার মঙ্গলকোট গ্রামের বিমল কৃষ্ণ ঘোষের মেয়ে শিলা রায় ঘোষকে বিয়ে করেন। তিনি এক ছেলে ও তিন মেয়ের জনক।

বিমল রায় চৌধুরী যশোর জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। জিলা স্কুলে পড়াকালীন সময়ে ১১ বছর বয়সেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৩৬ সালে জিলা স্কুলে পড়াকালে ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন।

১৯৪২ সালে প্রথম বিভাগ পেয়ে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৪৩ সালে যশোর এমএম কলেজে ভর্তি হন। এসময় তিনি মৎস্যজীবী ও কৃষক সমিতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৪৫ সালে জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৪৫ সালেই তিনি আইএসসি পাশ করেন। ১৯৪৭ এর দেশ বিভক্তির পর এই কলেজ থেকেই ১৯৪৮ সালে বিএ পাশ করেন তিনি।

১৯৪৯ সালে তেভাগা আন্দোলনে বাঘারপাড়া ও নড়াইলের নমঃশূদ্র অধ্যুষিত এগারখান অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেন।

মাতৃভাষা রক্ষায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধে বিমল রায় চৌধুরী গ্রেফতার হন। এক মাস পর মুক্ত হন।   

১৯৫৪ সালের ৩০ মে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার হন এবং প্রায় দেড় বছর কারাভোগ করার পর ১৯৫৬ সালে মুক্তি পান। কারাগারে আন্দোলন করার অপরাধে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে দুমাস, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে তিন মাস ও কুমিল্লা কারাগারে দুমাস রাজবন্দি হিসেবে কারাযাপন করেন এবং বাকি সময় তিনি ঢাকা ও বহরমপুর কারাগারে বন্দি থাকেন। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয় এবং কিছুদিন পর মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালে সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় তাকে আবারও গ্রেফতার করা হয় এবং দুই মাস পরে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জড়িত থাকেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি আবারও গ্রেফতার হন এবং কিছুদিন পর মুক্তি লাভ করেন।

ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা বিমল রায় চৌধুরী

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মার্চ মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের বিনামূল্যে বোমা সরঞ্জাম সরবরাহ করেন। ২৮শে মার্চ পুলিশ লাইন থেকে বাঙালি পুলিশ বের হয়ে আসে। ২৯ মার্চ যশোর জেলখানা আক্রমণ ও জেলবন্দিদের মুক্তিতে সহায়তা করেন বিমল রায় চৌধুরী। রাতে ইপিআর, পুলিশ ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের আর্মিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ৩১ মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে তাদের বাড়ি আক্রমণ করে পাকিস্তানি আর্মি।

বিমল রায় চৌধুরী ১৮ এপ্রিল ভারতে প্রবেশ করেন এবং বনগাঁ ক্যাম্পে ৪টি মুক্তিযুদ্ধের শিবিরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৮ আগস্ট তিনি পলিটিক্যাল লিয়াজোঁ হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার দায়িত্ব পালন করেন। ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর ৭ ডিসেম্বর যশোরে ফিরে আসেন তিনি।

এরপর ১৯৭৪ সালে বাকশালের রাজনীতির সাথে জড়িত হন বিমল রায় চৌধুরী।

প্রসঙ্গত, বিমল রায় চৌধুরী ১৯৬৪ সালে বিডি সিস্টেমে (বেসিক ডেমোক্রেসি) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সদস্য হন। ওই বছরই নওয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৮৮ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময়ে তিনি যশোর শিক্ষাবোর্ড ও যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার সময়ে ৫৪টি মসজিদ ও ৮টি মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। বাহাদুরপুর হাইস্কুল, নবনাগরী গার্লস স্কুল, তালবাড়িয়া হাইস্কুল, ঘুরুলিয়া হাইস্কুল, পাঁচবাড়িয়া গার্লস স্কুল ও মোমিননগর হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

জেলা ক্রীড়া সংস্থা (জেডিএস) জীবন সদস্য ও তিনবার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিমল রায় চৌধুরী।

 

/এএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম