বর্জ্যে বিবর্ণ শীতলক্ষ্যা

আমির হুসাইন স্মিথ, নারায়ণগঞ্জ
১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:৩৫আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:৩৮

দূষণে নদীর স্বাভাবিক পানি কালচে হয়ে উঠেছে, ভেসে যাচ্ছে পলিথিনে মোড়া বর্জ্য শীতে অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা। স্বচ্ছ পানি কালচে রঙ ধারণ করেছে। সঙ্গে আছে দুর্গন্ধ। কুচকুচে কালো আর উৎকট দুর্গন্ধের পানি ব্যবহার তো দূরের কথা, নদী পথে চলাচলই এখন দুরূহ হয়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের চর সৈয়দপুর থেকে নরসিংদীর পলাশ পর্যন্ত কমপক্ষে অর্ধশতাধিক নালা, ড্রেন ও খাল দিয়ে এসে পড়া শিল্প বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্যসহ নানা বর্জ্যের কারণে শীতলক্ষ্যা রূপ হারিয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর শ্যামপুর, পাগলা, নয়ামাটি, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল, শিমরাইল,  আরামবাগ, ডেমরা, কোনাপাড়া, রূপগঞ্জ, কাচঁপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত ডাইং, কেমিক্যাল বর্জ্যসহ পলিথিন এবং পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্যসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নদীতে এসে পড়ে। এছাড়া খাল বিল, ক্যানেল ও ড্রেনের মধ্যে ময়লা আবর্জনা এসে পড়দে এ নদীতে। বর্জ্যের কারণে শুধু শীতলক্ষ্যাই নয়, নারায়ণগঞ্জের সব খাল-বিল ও নালার পানিও দূষিত হয়ে উঠেছে।

পরিবেশ অধিদফতরের হিসাবে অনুযায়ী, প্রতিদিন শুধু অপরিশোধিত ১৫ কোটি লিটার শিল্প বর্জ্য বিভিন্ন খাল-বিল দিয়ে এসে শীতলক্ষ্যায় পড়ছে। এছাড়া সিটি করপোরেশনের পয়ঃনিষ্কাশন ও গৃহস্থালী বর্জ্য, পলিথিন, বাজারের উচ্ছিষ্ট অংশ, হোটেল রেস্তোরাঁর বর্জ্যসহ আরও কয়েক কোটি লিটার বর্জ্য এসে মিলে শীতলক্ষ্যায়।

দূষণে কালচে হয়ে পড়েছে নদীর স্বাভাবিক পানি সূত্রটি আরও জানায়, শীতলক্ষ্যা নদীতে লিটার প্রতি ডিও মেনাস ডিজলভ অক্সিজেন থাকার কথা ৪-৬ মিলিগ্রাম। কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র ১-২ মিলিগ্রাম। নদীর পানিতে অক্সিজেন বেশি মাত্রায় কমে যাওয়ায় মাছসহ জলজ প্রাণী টিকতে পারছে না।  

পরিবেশ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, শুধু নারায়ণগঞ্জ অংশে তরল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩১৮টি। প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠানেই পরিশোধন প্রকল্প ইটিপি প্ল্যান্ট রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ না বাড়াতে ইটিপি প্ল্যান্ট চালানো হয় না বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে। যে কারণে প্ল্যান্ট থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিশোধিত বর্জ্যে দিন দিন নদীর পানির রঙ কালচে হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (পবা) নারায়ণগঞ্জ শাখার সভাপতি এ বি সিদ্দিক জানান, পরিবেশ দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নামমাত্র জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করছে পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। কিন্তু তারা পরিবেশ দূষণ বন্ধে কঠোর কোনও ব্যবস্থা নেয় না। বছরের পর বছর নোটিশ দেওয়ার পর যেসব প্রতিষ্ঠান এখনও বর্জ্য পরিশোধনে ইটিপ প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি তাদের কারখানা বন্ধ ও সিলগালা করা হয়নি। অধিদফতর সব সময় বলছে, লোকবলের অভাবে তারা মনিটরিং করতে পারছে না। তবে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে বিদ্যমান আইনেই পরিবেশ দূষণ রোধ করা সম্ভব হতো।

শুষ্ক মৌসুমে শীতলক্ষ্যা পাড়ে দাঁড়ানোই দায় উল্লেখ করে সোনারগাঁও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে স্রোত কমে যায় এবং শিল্প কলকাখানার অপরিশোধিত বর্জ্য এসে মিশে পানি দূষিত হয়ে উৎকট দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে শীতলক্ষ্যার কাছে দাঁড়িয়ে থাকাই দুরূহ হয়ে পড়ে। নাকে রুমাল চেপে ধরে খেয়া পারাপার হতে হয় সাধারণ যাত্রীদের। 

বর্জ্যে দূষিত খালের পানি গিয়ে মিশছে শীতলক্ষ্যার পানিতে শীতলক্ষ্যা নদী পার হয়ে প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জে আসেন বন্দরের একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান। তিনি জানান, শীতলক্ষ্যা নদীর পানি এতটাই বিষাক্ত এবং দুর্গন্ধ যে নাকে রুমাল চেপে নদী পারাপার হতে হয়।

তিনি বলেন, নদীর পানি যতই কমবে ততই বাড়বে দূষণের মাত্রা। এই পানি  দিয়ে গোসল তো দূরের কথা, পানি হাতে বা শরীরের কোনও অংশে লাগলে চুলকানিসহ নানা ধরনের রোগবালাই হচ্ছে।  

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঢাকা বিভাগের রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ডা. তানভীর আহমেদ চৌধুরী জানান, শিল্পকারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য পানি খাল ও নদীতে মিশে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ করছে। এই দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে মানুষের শরীরে নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এই পানি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করলে শরীরে ক্যানসারসহ নানা ধরনের বড় রোগ হতে পারে।

নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক নয়ন মিয়া জানান, নারায়ণগঞ্জে তরল বর্জ্য নির্গমনকারী ৩১৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি প্ল্যাট স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু তারা রাতের বেলায় অপরিশোধিত পানি সরাসরি নদী বা খালে ছেড়ে দেয়। জনবল সংকটের কারণে মনিটরিং করা যাচ্ছে না। 

তিনি বলেন, ‘এসব কারখানা মনিটরিংয়ে অধিদফতর অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে।  ইটিপি প্ল্যান্টের ডিভাইসে সফটওয়্যার বসিয়ে রেকর্ড রাখা হবে। এছাড়া  ইটিপিতে আলাদা বিদ্যুতের সাব-মিটার স্থাপন করা হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে যাদের ইটিপি আছে কিন্তু চালায় না তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবো। এতে  নদী দূষণের মাত্রা কমে আসবে।’

শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির দূষণ বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়া বলেন, শীতলক্ষ্যাসহ নদী দূষণের জন্য দায়ী কারণগুলো চিহ্নিত করে সশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। যাতে মন্ত্রণালয় তাদের নতুন এজেন্ডায় তা অন্তর্ভুক্ত করে জনস্বার্থে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে।

/টিটি/এসটি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কৃষকদের হয়রানির বিষয়ে জানতে চাওয়ায় সাংবাদিকের ওপর চটে গেলেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক
কৃষকদের হয়রানির বিষয়ে জানতে চাওয়ায় সাংবাদিকের ওপর চটে গেলেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক
সংসদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা কতটা জরুরি
সংসদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা কতটা জরুরি
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
মৌচাকে ছুরিকাঘাতে সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে হত্যা 
মৌচাকে ছুরিকাঘাতে সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে হত্যা 
সর্বাধিক পঠিত
হোটেলে ইউপি সদস্যের লাশ, কীভাবে মৃত্যু হলো জানালেন সেই নারী
হোটেলে ইউপি সদস্যের লাশ, কীভাবে মৃত্যু হলো জানালেন সেই নারী
যেকোনও মূল্যে মাজারের সেই কুমির ফেরত চান খাদেম
যেকোনও মূল্যে মাজারের সেই কুমির ফেরত চান খাদেম
ভুটানের ভূমিকম্পে কাঁপলো ঢাকাসহ সারা দেশ
ভুটানের ভূমিকম্পে কাঁপলো ঢাকাসহ সারা দেশ
পেনাল্টি, লাল কার্ড ও মারামারির ম্যাচে মালদ্বীপকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ 
পেনাল্টি, লাল কার্ড ও মারামারির ম্যাচে মালদ্বীপকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ 
কবর খুঁড়তে গিয়ে প্রাণ হারালেন ২ জন
কবর খুঁড়তে গিয়ে প্রাণ হারালেন ২ জন