পাবনার সুজানগর উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী রাজবাড়ী দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে একটি প্রভাবশালী মহল বালু উত্তোলন করে নিজস্ব রশিদের মাধ্যমে বিক্রি করছে। অবৈধভাবে এ বালি উত্তোলনে নদীভাঙনের ফলে বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে শত শত পরিবার, নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি। আর সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
এদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ টু পাকশী চ্যানেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ১৫টি সেগমেন্টে খননের বিপরীতে শতাধিক বাল্কহেড/বাংলা ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের ফলে চ্যানেলটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হুমকির মুখে পড়তে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি নিয়মের বাইরে একটি প্রভাবশালী মহল পাবনার সুজানগর, রাজবাড়ী জেলার ধাওয়াপাড়া ও কালুখালীসহ পদ্মানদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করে তা প্রকাশ্যে বিক্রিও করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মোটা টাকার বিনিময়ে জনপ্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বালু তোলা হচ্ছে। নির্বিঘ্নে তারা বালি উত্তোলন করে চললেও সংশ্লিষ্টরা নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে।
তথ্যমতে, জেলার সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ, সাতবাড়ীয়া, ভায়না, পৌরসভার সীমান্তবর্তী এবং রাজবাড়ী জেলার জৌকুড়া, ধাওয়াপাড়া, কালুখালী ও প্রস্তাবিত সেনানিবাস এলাকার পদ্মা নদী থেকে নিয়মিতভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়রা বালু উত্তোলনকারীদের একাধিকবার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা তোয়াক্কা না করে বালু উত্তোলনের নামে গ্রামকে গ্রাম বিলীনের সর্বনাশা খেলায় মেতেছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার নদীপাড়ের মানুষেরা একত্রিত হয়ে বালু উত্তোলন কাজে নিয়োজিতদের ধাওয়া দিলে তারা বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার মেশিনসহ অন্যান্য মালামাল নিয়ে রাজবাড়ী অভিমুখে চলে যায়। আবার সুযোগ বুঝে ফিরে এসে একই কাজে লিপ্ত হয়।
সংশ্লিষ্ট এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে আলাপকালে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই অঞ্চলে বালি উত্তোলন ও বালি ব্যবসাকেন্দ্রিক প্রভাবশালীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটে প্রভাবশালীদের মধ্যে শিমুল ও তপন অন্যতম। সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা। প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে বা এই কর্মের প্রতিবাদ জানাতে সাহস পাচ্ছেন না।
জানা যায়, পদ্মা নদী তীরবর্তী কোথাও কোনও বালু মহালের ইজারা নেই। সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই রাত-দিন ধরে অবৈধভাবে বালু ব্যবসায়ীরা বালু উত্তোলন করছে। বালি উত্তোলনের পর রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখায় দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের নাজিরগঞ্জ বাজারের আশপাশের এলাকাসহ বরখাপুর, বুলচন্দ্রপুর, সাতবাড়ীয়া ইউনিয়নের সাতবাড়ীয়া বাজার থেকে শ্যামনগর ও ভাটপাড়া রাস্তার পাশে এবং রাজবাড়ী জেলার জৌকুড়া, ধাওয়াপাড়া, কালুখালী ও প্রস্তাবিত সেনানিবাস এলাকার বিভিন্ন স্থানে বালু রাখার কারণে যানবাহন চলাচলেও মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। আর এসব সড়ক দিয়ে ভোর রাত থেকে ট্রাক, ট্রাক্টর, দিয়ে বিভিন্ন স্থানে বালু পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে ভারী যান চলাচলে রাস্তার অবস্থাও নাজুক হয়ে পড়েছে। বালুবোঝাই ট্রাক চলাচলের কারণে রাস্তাগুলো চলাফেরার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। স্থানীয় জনগণ বালু উত্তোলনকারীদের বাধা দিলে তারা মিথ্যা মামলা দায়েরসহ বিভিন্ন হুমকি দিয়ে আসছে।
বালি উত্তোলনকারী সিন্ডিকেটের শিমুল মোল্লা ফোনে বলেন, ‘বিআইডাব্লিউটিএ’র খননকৃত বালি পে-অর্ডারের মাধ্যমে ক্রয়ে করেছি। সেই বালি বিক্রি করছি। পদ্মা থেকে কোনও বালি উত্তোলন করছি না।’
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিআইডাব্লিউটিএ’র প্রকৌশলী সুলতান আহমেদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে সুজানগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুজিৎ দেবনাথ বালি উত্তোলনের বিষয়ে বলেন, ‘খবর পেলেই বালি উত্তোলনস্থলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। কিন্তু আমাদের যাওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে।’ অন্যদিকে জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘অবৈধভাবে বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ ঢাকার এক পত্রে জানা যায়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থেকে পাবনার পাকশীর পদ্মা নদী পর্যন্ত ১৫টি সেগমেন্টে খনন চলছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ লক্ষ করছে, এই রুটে শতাধিক বাল্কহেড/বাংলাড্রেজার দিয়ে দিনরাত্রি অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে চ্যানেলটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে করে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভারী মালামাল পরিবহনে সমস্যা দেখা দেবে। ফলে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে হুমকির সন্মুখীন হবে। সেই লক্ষ্যে অবৈধ বাল্কহেড/বাংলা ড্রেজার বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেই।








