গত ১২ দিন ধরে পানিতে তলিয়ে আছে গাইবান্ধার সাত উপজেলার চরাঞ্চলের চারশ’২৪টি গ্রাম। পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৩৯৭ জন। দুর্গত এলাকার অধিকাংশ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়ন প্রকল্প, উঁচু জায়গা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও স্কুল-কলেজের বিভিন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। কয়েকদিন ধরে পানিবন্দি থাকায় তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত নানা রোগ। জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত বন্যা পরিস্থিতির সর্বশেষ প্রতিবেদনে (২৩ জুলাই) বলা হয়েছে, গাইবান্ধার সাত উপজেলায় বন্যায় ৫৯ হাজার ৮৭০টি পরিবারের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে ১৪ হাজার ২১ হেক্টর জমির আউশ ধান, আমন বীজতলা, পাট ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসল। মরে-ভেসে গেছে প্রায় ৬ হাজার ২৯০টি পুকুরের মাছ। বিধ্বস্ত হয়েছে প্রায় ৫৯৩ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, ২৬৬ কিলোমিটার পাকা সড়ক ও ১৯ কিলোমিটার বাঁধ। ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছোট-বড় ৩১টি ব্রিজ ও কালভার্ট।
খোলা আকাশ আর রোদের মধ্যে আশ্রয় নেওয়া মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে দু’দিন ধরে থেমে থেমে চলা বৃষ্টি। প্রবল বৃষ্টির কারণে বন্যার পানি ধীরে ধীরে আবার বাড়তে শুরু করেছে। ত্রিপল, কাপড় আর ছাপড়া ঘর তুলে আশ্রয় নেওয়া বন্যার্ত মানুষের দুর্ভোগ ও ভোগান্তি বেড়েছে। গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি নিয়ে কোনও রকমে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন তারা।
তবে প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বিতরণ করা ত্রাণ সামগ্রী চাহিদার তুলনায় অনেক কম বলে অভিযোগ করেছেন বানভাসীরা। অনেক এলাকায় ওষুধসহ চিকিৎসা সেবা মিলছে না। বন্যার কারণে সাত উপজেলার ৪৪৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ইতোমধ্যে। গত এক সপ্তাহে পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সড়ক ও বাঁধের অন্তত ২০টি পয়েন্ট ভেঙে ও ধ্বসে যাওয়ায় গাইবান্ধা জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার। বাদিয়াখালি-ত্রিমোহনী রেল লাইনে পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে গেছে এক কিলোমিটার এলাকার স্লিপার, ধ্বসে গেছে পাথর। এতে এক সপ্তাহ ধরে গাইবান্ধা থেকে বোনারপাড়া রেল যোগাযোগ চলছে বিকল্প পথে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বুধবার (২৪ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত দূর্গত এলাকায় ১ হাজার ৭০ মেট্রিকটন চাল, ৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, নগদ সাড়ে ১৯ লাখ টাকা ও বিশুদ্ধ পানির জন্য ১৫০টি টিউবয়েল ও ৫ হাজার বিশুদ্ধ পানির বোতল এবং ৫০০টি ত্রিপল বিতরণ করা হয়েছে। জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় ১৮০টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে দূর্গত এলাকায়। বন্যায় ১৯৭টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ।
জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন জানান, দূর্গত মানুষের জন্য মজুত প্রায় ৮০ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ও ২০০টি ত্রিপল বিতরণের কাজ চলছে। এছাড়া দূর্গত এলাকার মানুষের জন্য আরও ১ হাজার মেট্রিক টন চাল, ১০ লাখ টাকা ও ৫ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
বানভাসীদের ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সাত উপজেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। তবে লোকবল আর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় কিছু এলাকায় দূর্গতদের মাঝে ত্রাণ পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।’
ফের বাড়ছে নদীর পানি, বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা
এদিকে প্রবল বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গাইবান্ধার নদ-নদীগুলোর পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি ৭ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার (২৪ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান। তিস্তা, করতোয়াসহ সব নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
গত শনিবার (২০ জুলাই) থেকে নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু গত মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) থেকে আবারও থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি ফের বাড়তে শুরু করেছে। ফলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বন্যা দূর্গত এলাকার মানুষ।








