শর্ত সাপেক্ষে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে মিয়ানমার রাজি বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসা মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে। রবিবার (২৮ জুলাই) বিকালে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের আমরা নাগরিকত্ব দিতে প্রস্তুত। তবে ১৯৮২ সালের মিয়ানমারের আইন অনুযায়ী প্রত্যেককে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এছাড়াও যারা দাদা, মা ও সন্তান এই তিনের অবস্থানের প্রমাণ দিতে পারবে, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। একইভাবে ন্যাশনাল ভ্যারিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) অনুযায়ী যারা কাগজপত্র দেখাতে পারবে, তাদেরও নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে আরও বলেছেন, ‘দুই দিন ধরে একাধিক বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের প্রস্তুতি সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিন দফার বৈঠকে রোহিঙ্গাদের দাবিগুলো জানা গেছে। প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তিন ক্ষেত্রে আলোচনা করার। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছে, তা আবারও হবে। একই সঙ্গে আসিয়ানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। মার্চ মাসে দেওয়া আসিয়ানের রোহিঙ্গা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা বিবেচনা করা হবে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের আলোচনার মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত বৈঠক হবে ঢাকায় ফিরে।’
এর আগে, দ্বিতীয় দিনের মতো মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটি রবিবার সকালে কুতুপালং ৪ নম্বর ক্যাম্পে যায়। টানা ২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠকে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের কাছে নিজেদের নানা দাবির কথা জানান রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গারা বলেছেন, নাগরিকত্ব, স্বাধীন চলাফেরার নিরাপত্তা প্রদান করলে তারা স্বদেশে ফেরত যাবে।
মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা তাদের কথা শোনেন এবং রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরার আহ্বান জানান। ফেরত গেলে তাদের দাবিগুলো বিবেচনা করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গারা।
দুপুরে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটি রোহিঙ্গা হিন্দু ক্যাম্প পরিদর্শনে যায়। সেখানে রোহিঙ্গা হিন্দুদের সঙ্গে আলাপ করে। এ সময় হিন্দু রোহিঙ্গারা কোনও দাবি বা শর্ত ছাড়াই মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হয়েছে। তবে মুসলিম রোহিঙ্গাদের মতো খ্রিস্টান রোহিঙ্গারাও নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলকে।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে’র নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল শনিবার কক্সবাজার পৌঁছায়। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন এবং রোহিঙ্গাদের ৪০ জনের একটি দলের সঙ্গে ২ দফায় আলাপ আলোচনা শুরু করেন তারা।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর রাখাইন রাজ্যে চলা হত্যা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বর্তমানে তারা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে পাহাড়ে ৩২টি ক্যাম্পে অবস্থান করছে। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার পর রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তিতে সই করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। সব রকমের প্রস্তুতির পরও মিয়ানমার রহস্যজনক কারণে চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি। পরে জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করে। চীনের ভূমিকা অস্পষ্ট থাকলেও সম্প্রতি তারাও সবুজ সংকেত দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এর আগে ২০১৭ সালের ১৯ ও ২০ মার্চ রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের ‘মিথ্যেবাদী’ বলে পাশ কাটাতে চেয়েছিল মিয়ানমার। তবে আবারও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ায় রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিন দেখতে দ্বিতীয়বারের মতো মিয়ানমারের উচ্চপর্যায়ের এই প্রতিনিধি দলের আগমন বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্ট মহল।








