খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস কর্তৃপক্ষ মিলের জমি হস্তান্তর ও ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ অবস্থায় সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মিলের বকেয়া ৩১৫ কোটি টাকা ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ব্যাংক থেকে মিলের প্রধান ফটকে নোটিশও ঝুঁলানো হয়েছে। চালু থাকা অবস্থায় মিলের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে সোনালী ব্যাংক করপোরেট শাখা থেকে ১৯৯৮ সালে মিলের ৮৮ দশমিক ৬৭৫ একর জমি বন্ধক রেখে ৫৭ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে নিউজপ্রিন্ট কর্তৃপক্ষ। যা ২০১৮ সালে সুদ-আসলে ৩৭০ কোটি ২৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে নিউজপ্রিন্ট মিল কর্তৃপক্ষ এই দায়ের মধ্যে ৫৫ কোটি ৯৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা বকেয়া পরিশোধ করে। এ অবস্থায় ব্যাংকের বকেয়া দাঁড়ায় ৩১৫ কোটি টাকায়।
সূত্র মতে, ২০১৫ সালে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় নিউজপ্রিন্ট মিলের জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিউজপ্রিন্ট মিলের জমি কেনার জন্য নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড এর সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির ৫০ একর জমি বিক্রির জন্য মূল্য নির্ধারণ হয় ৫৮৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এতে বলা হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৫৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৩২ কোটি ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। সে অনুযায়ী এ অর্থবছরের ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড ২শ’ কোটি টাকা শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়।
মিল সূত্রে জানা যায়, এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নিউজপ্রিন্ট মিলের ৫০ একর সম্পত্তির ওপর নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির সীমানা খুঁটি স্থাপন করে। এরপর সোনালী ব্যাংক নড়ে চড়ে বসেছে। মিলের জমির মালিকানা হস্তান্তরের আগে সকল বকেয়া পরিশোধের জন্য ফেব্রুয়ারি মাসে মিল, বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ ও পাওয়ার কোম্পানিকে চিঠি দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। তবে চিঠির কোনও উত্তর বা মিল কর্তৃপক্ষ সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে কোনও আলোচনা করেনি। ফলে মিলের প্রধান ফটকে বন্ধকী নোটিশ লাগানো হয়েছে।
এদিকে, বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি, হস্তান্তর ও অপসারণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও মিল কর্তৃপক্ষ সেটি আমলেই নেয়নি। এমনকি ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্থাপনা ও ভবন বিক্রির টেন্ডার সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিতের জন্য বিসিআইসি ও মিল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। তারপরও তা বন্ধ করা হয়নি। ফলে মর্টগেজ মুক্ত না করেই জমি বিক্রির প্রক্রিয়া এবং স্থাপনা অপসারণ ও গাছপালা কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে নিউজপ্রিন্ট মিলে গিয়ে দেখা যায়, মিলের প্রধান ফটক থেকে ডান দিকে আবাসিক ভবনের প্রবেশ মুখেই স্থাপন করা হয়েছে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড’র ‘রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্প’ নামে একটি সাইনবোর্ড। আর ভেতরে মিলের মূল অংশ বাদে কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের কোয়ার্টার, হাসপাতাল, বিনোদন কেন্দ্রসহ অন্যান্য স্থাপনা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মেহগুনিসহ মূল্যবান গাছপালাও কেটে সাবাড় করা হয়েছে। বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছ থেকে টেন্ডার প্রাপ্ত মেসার্স সুভাস দত্ত এন্টারপ্রাইজ’র কাছ থেকে একাধিক হাত বদল হওয়া সর্বশেষ ঠিকাদার শ্রমিক দিয়ে এসব স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন। মিলজুড়েই যেন লুটপাটের মহাযজ্ঞ চলছে। এসব কাজ কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গেই করা হচ্ছে।
একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রহরী, অন্যদিকে ঠিকাদারের লোকজন এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতা-কর্মীদের প্রহরায় চলছে এসব কর্মযজ্ঞ। ফলে বাইরের থেকে কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারছেন না। এমনকি সাংবাদিকদের প্রবেশের ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংক, খুলনা করপোরেট শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মুন্সী জাহিদুর রশীদ জানান, নিউজপ্রিন্ট মিল কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে মিলের জমি অন্য জায়গায় হস্তান্তর ও ভাঙার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি মর্টগেজ অবস্থায় রয়েছে তা জানিয়ে দেওয়ার জন্য মিলের প্রধান ফটকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আগেও মিলের ভেতরে অনুরূপ দু’টি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ছোট করার জন্য নয়, আইনগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা জানানোর জন্য এ পদক্ষেপ। কবে নাগাদ বকেয়া টাকা পরিশোধ করবে, এ সম্পর্কেও নিউজপ্রিন্ট মিল কর্তৃপক্ষ কিছু বলেনি। এতদিন পর বন্ধকী নোটিশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দু’টি প্রতিষ্ঠানই সরকারি। তাই একটি সমঝোতার মধ্যে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে মিলের জমি অন্য জায়গায় হস্তান্তর ও ভাঙার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারি। এ কারণে এতদিন পর প্রধান ফটকে নোটিশ।
নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির সহকারী প্রকৌশলী ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, মিলের ৫০ একর জমির ওপর ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কমবাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হবে। কেন্দ্রে ভারত থেকে আমদানি করা তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
মিলের একটি সূত্রে জানা গেছে, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির নির্ধারিত ৫০ একর জমি কবে রেজিস্ট্রি হবে তার দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আর কবে নাগাদ ব্যাংকের বকেয়া পরিশোধ হবে তাও চূড়ান্ত হয়নি। তবে আলোচনা করে তাদের পাওনা পরিশোধ করা হবে।
নিউজপ্রিন্ট মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার মজুমদার বলেন, 'জমি বিক্রির বিষয়টি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবকিছু হচ্ছে। তবে, বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এখনও মিলের জমি দলিল করে দেওয়া হয়নি। কারণ, জমি সোনালী ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ রয়েছে। দলিলও ব্যাংকের কাছে রয়েছে। মর্টগেজ না ছাড়ানো পর্যন্ত দলিল করে দেওয়া সম্ভব হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিসিআইসির পরিকল্পনা বিভাগের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক আবুল কাশেম বলেন, 'মিলের জমি সোনালী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা। বিক্রির পর সেই টাকা দিয়ে জমি ছাড়ানো হবে ব্যাংকের কাছ থেকে।
উল্লেখ্য, ভৈরব নদের তীরে খুলনা নগরীর গোয়ালপাড়া মৌজায় ১০১ একর জমির ওপর ১৯৫৭ সালে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। পাঠ্যপুস্তক, র্যাপার বোর্ড ও সংবাদপত্র মুদ্রণে কাগজের চাহিদা পূরণ করতে ১৯৫৯ সালে উৎপাদন শুরু হয়। সুন্দরবনের গেওয়া কাঠ নির্ভরশীল এ মিলের বার্ষিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪৮ লাখ মেট্রিক টন। দেশ স্বাধীনের পর থেকে মিলে ক্রমাগত লোকসান হতে থাকে। লোকসান এড়াতে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করে।








