যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্প্রতি সাক্ষাৎ করেছেন রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ। মিয়ানমারে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার বেদনা, দুর্বিষহ জীবন ও শরণার্থী হওয়ার গল্প শুনিয়েছেন তিনি হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে। এসময় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চান তিনি।
ধর্মীয় কারণে নির্যাতনের শিকার বিশ্বের ১৭টি দেশের ২৭ জন প্রতিনিধি সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ। ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে মংডু টাউনসিপের সিকদার পাড়া গ্রাম থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন তিনি। আশ্রয় নেন কক্সবাজারের উখিয়া কতুপালং চাকমারকূল ক্যাম্পে।
বুধবার (৩১ জুলাই) বিকালে এই ক্যাম্পের পাশে ছোট্ট ঝুপড়িতে এআরএসপিএইচ-এর অফিসে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন মুহিব উল্লাহ।
এআরএসপিএইচ-এর চেয়ারম্যান মুহিব জানান, ১৩ জুলাই বাংলাদেশ সরকারের একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখার করার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। সেখানে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ নামে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য রাখারও সুযোগ পাবেন। মুহিব বলেন, ‘খবরটি শুনে প্রথমে হতবাক হয়েছি। কেমনে হতভাগা এই রোহিঙ্গা বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে যাবে হোয়াইট হাউসে! অবশেষে ১৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ শিরোনামে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিই। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। সেখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন ছাড়াও সেদেশের উচ্চপর্যযারে কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চার ঘণ্টার বৈঠকের পর হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাদের। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রিয়া সাহাও ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন।’
এ সময় মুহিব উল্লাহ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, ‘সব রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে তার (ট্রাম্পের) পরিকল্পনা কী? এর জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘সেই কোথাকার রোহিঙ্গা? এসময় ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ানো (পিএস) অন্য একজন বলেন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরাণার্থী ‘বার্মা থেকে আসা’। বাংলাদেশ কোথায় জানেন না এমন কোনও মন্তব্য করেননি প্রেসিডেন্ট।’
তবে এর আগে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের উপস্থিতিতে এক বক্তৃতায় রোহিঙ্গা নেতা মুহিব বলেন, ‘শুরুতে ধন্যবাদ জানাই, খরচ বহন করে কোনও রোহিঙ্গাকে সরকারিভাবে এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণের জন্য। এরপর বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাই যে, সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে, থাকার ও খাবারের সুন্দর ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। আমরা গণহত্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমি (মুহিব) গণহত্যা থেকে বেঁচে আছি। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া আশ্রিত হয়েছি।’
ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘৫০ বছর ধরে মিয়ানমার সরকারের গণহত্যার শিকার হয়ে আসছি। তারা গত ২০১৬-১৭ সালে (দুই বছরে) ১০ হাজার ৫৫৬ মানুষকে হত্যা করেছে। ধর্ষণ-গণধর্ষণ করেছে ১৮ হাজার ৩৪৪ জন নারীকে। ৮৮টি গণকবরের সন্ধান মিলেছে। বেআইনিভাবে দুই হাজার ৫৫৭ জন মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া, এক হাজারের বেশি মসজিদ এবং দেড় হাজারের বেশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। পাশাপাশি ৭৫ হাজার ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। লুটপাট করেছে জমি-জামা ও সহায় সম্বল। সেখানে কোনও ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই। শিক্ষা-উচ্চ শিক্ষা, চাকরিসহ জীবনের কোনও কিছুই নেই।’
হোয়াইট হাউসের অনুষ্ঠানে মুহিব বলেন, ‘এখনও মিয়ানমারে দুই লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসাবে ক্যাম্পে বসবাস করছে। এর বাইরে যারা রয়েছে, তারাও সহিংসতার ভয়ে আছে। মিয়ানমার সরকার এখনও কোনও নাগরিক অধিকার দেয়নি। রোহিঙ্গাদের এক হাজারের বেশি মসজিদ ও আবাসস্থল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা নিপীড়নকে জাতিগত নিধন বললেও গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়নি। মিয়ানমারে সংসদ নির্বাচনে কেবল ২০১৫ সাল ছাড়া অন্যসব নির্বাচনে রোহিঙ্গারা ভোট দিয়েছে। ফলে সেদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের যথেষ্ট দলিলপত্র রয়েছে। এমনকি ২০১৪ সালে একজন নারীসহ ছয় জন রোহিঙ্গা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তারা হলেন— রোশিদ আহমেদ, আবদুল গফফার, সুলতান মুহাম্মদ, জুহুরা বেগম, জাওকির আহমেদ ও ডা. বোসির আহমেদ।’
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেন খুব শিগগিরই নিজ ভূমিতে (মিয়ানমারে) নাগরিকত্ব নিয়ে ফিরে যেতে পারে, সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতাও চান তিনি। ওই অনুষ্ঠানে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশ থেকে আসা শরণার্থীরা বক্তব্য রাখেন।
কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালেন জানতে চাইলে রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মনীতি মেনেই এ যাত্রা। গত ১৫ জুলাই বাংলাদেশ থেকে যাত্রা শুরু করি। প্রথমে দুবাই পৌঁছি এবং সেখান ১৬ জুলাই বিকালে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাই। এরপর সেখানে স্টেট প্লাজা নামে একটি হোটেলে উঠি। সফর শেষে গত ২১ জুলাই বাংলাদেশে ফিরে আসি। তবে আগে থেকেই এসব প্রস্তুতি ঠিক করে রেখেছিলেন সংশ্লিষ্টরা।’
হোয়াইট হাউস থেকে কী বার্তা নিয়ে আসলেন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই সফর রোহিঙ্গাদের জন্য গুরুত্ব বহন করে। আগের চেয়ে মিয়ানমার সরকারের প্রতি চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিয়ানমার সরকারের ওপরে আস্তে আস্তে নিষেধাজ্ঞার ধাপ বাড়ছে। এছাড়া, চীনও আগের জায়গা থেকে একটু সরে এসেছে।’
কিছুদিন আগে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের পরিদর্শনও তার যুক্তরাষ্ট্রে সফরের সাফল্যের অংশ বলে মনে করেন মহিব উল্লাহ। তবে বাংলাদেশের মতো সবাই চাপ অব্যাহত রাখলে আগামী এক বছরের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন মুহিব। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ অনুষ্ঠানে তার সফরসঙ্গী হিসেবে মুহাম্মদ নওখিম নামে আরও এক রোহিঙ্গা তরুণ গিয়েছিলেন।








