বন্যা হয়নি তবু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতে খরচ ৬৭ লাখ টাকা!

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
০৭ আগস্ট ২০১৯, ২০:৪৬আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৯, ২২:০১

সদর উপজেলার গোষ্টের ডাঙ্গায় বালু ফেলে এই বাঁধে খরচ দেখানো হয়েছে ৩০ লাখ টাকা দেশের বেশ কিছু জেলায় এ বছর বন্যা হয়েছে। তবে দিনাজপুরে এখনও বন্যার প্রভাব পড়েনি। বৃষ্টিপাত হলেও জেলার নদীগুলোর পানি ছিল বিপদসীমার অনেক নিচে। দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, গত ৬ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত দিনাজপুরে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৪৪৭ মিলিমিটার। তবে বন্যা না হলেও এর প্রভাবে বাঁধ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে ‘আপৎকালীন ব্যবস্থা’ হিসেবে এরইমধ্যে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ মেরামতের নামে ৬৭ লাখ টাকা খরচ করেছে দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নামমাত্র কাজ দেখিয়ে সিংহভাগ টাকাই আত্মসাৎ করা হচ্ছে। নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেই বন্যার আতঙ্কে দিন কাটাতে হয় তাদের।

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চলতি জুলাই মাসে দিনাজপুর সদর উপজেলার ২নং সুন্দরবন ইউনিয়নের গর্ভেশ্বরী নদীর উৎসমুখে গোষ্টেরডাঙ্গা এলাকায় বাঁধ মেরামতে ৩০ লাখ টাকা, বিরল উপজেলার রাজারামপুর গ্রামে ঢেপা নদীর দুটি স্থানে বাঁধ মেরামতে ১৮ লাখ টাকা, সদর উপজেলার কর্ণাই গ্রামে ঢেপা নদীর বাঁধ মেরামতে ১০ লাখ টাকা এবং বিরল উপজেলার মালঝাড় চকচকা বাঁধ মেরামতের জন্য খরচ হয়েছে নয় লাখ টাকা।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাগজে-কলমে এসব খরচ দেখালেও এসব বাঁধ মেরামতের বিষয়ে সরেজমিন দেখা যায় উল্টো চিত্র। ২নং সুন্দরবন ইউনিয়নের সুন্দরবন গোষ্টেরডাঙ্গা বাঁধে গিয়ে দেখা যায়, বালু দিয়ে কোনোরকমে মেরামত করা হয়েছে সেটি। মেরামত করা হলেও বালু দিয়ে কাজ করায় চুইয়ে চুইয়ে পানি আসছে। যেকোনও সময় ভারী বৃষ্টি হলেও মেরামত করা বাঁধের অংশের হদিস মিলবে না। কাগজে ৪১০ মিটার দেখানো হলেও বাস্তবে এটি দেড়শ’ মিটারের বেশি নয়। এই বাঁধ মেরামতে ৩০ লাখ টাকা খরচ দেখানো হলেও এলাকাবাসীর অভিযোগ বিস্তর। এর আগেও ২০১৭ সালে এই বাঁধ মেরামতে খরচ দেখানো হয়েছে ২৮ লাখ টাকা।

সুন্দরবন গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, ‘ছোট বাচ্চারা বালুচরে বালু দিয়ে ঘর নির্মাণ করে। পানির ঝাপ্টা এলে আবার তা বিলীন হয়ে যায়। এই বাঁধ মেরামতের নামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজটিও সেরকম।’

একই এলাকার রিয়াজুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সরকারের টাকা খরচ দেখানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।’ ওই এলাকার আফজালুর রহমান, ইছাহাক আলীসহ অনেকে জানান, বাঁধ মেরামতের নামে এমনিতেই কোনও অবলম্বন ছাড়াই বালু দেওয়া হয়েছে, তার ওপর যেখানে মূল স্রোতের ধাক্কা লাগতে পারে,সেই জায়গাটিই মেরামত করা হয়নি। তাই এটা কোনও কাজেই লাগবে না। শুধু কাজের নামে সরকারি অর্থ লোপাট।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু মেরামতের নামে অর্থ লোপাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থায়ী সমাধান চাই। যাতে বন্যার সময়ে ক্ষতির হাত থেকে তারা রক্ষা পান। এলাকার রিয়াজুদ্দিন (৫৫) জানান, গত বন্যাতেই এখানে বাঁধ মেরামতের কাজ দেখানো হয়েছে। প্রতিবারই এখানে কাজ দেখানো হয়। ছোটবেলা থেকেই এই দৃশ্য দেখে আসছি। এরপরও বন্যা এলে কোনও কিছুই রক্ষা হয় না আমাদের।

২নং সুন্দরবন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অশোক কুমার রায় জানান, আত্রাই নদীর গোষ্টেরডাঙ্গায় বালু দিয়ে বাঁধ মেরামত সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। এটা এলাকার কোনও উপকারে আসবে না। তিনি ভবিষ্যতে বন্যার কবল থেকে এলাকার মানুষকে রক্ষার জন্য ওই বাঁধ মেরামতের বিষয়ে স্থায়ী সমাধান চান।

এদিকে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রাজারামপুর গ্রামে ঢেপা নদীর বাঁধ মেরামতে সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে বালুর বস্তা রাখা হয়েছে,কিন্তু কাজ শুরু হয়নি। এখানে খরচ দেখানো হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। সেখানে বালুর বস্তার সাব-কন্ট্রাক্টর বিদ্যুৎ রায় জানান, প্রতি বস্তা বালু ২৮ টাকা দরে বালুভর্তির কাজ নিয়েছেন তিনি। এ পর্যন্ত বালুভর্তি করা হয়েছে দুই হাজার ৪শ’ বস্তা। আরও বালু ফেলা হবে বলে জানান তিনি।

এলাকার লোকজন অভিযোগ করেন, প্রতিবছরই নদীর পানি বাড়লে এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন আসেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। বন্যার পানিতে আমাদের যে দুর্ভোগ সেই দুর্ভোগই থেকে যায়।

এলাকাবাসীর এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফইজুর রহমান বলেন, ‘বালু দিয়ে বাঁধ মেরামতের নিয়ম আছে। এলাকাবাসী না বুঝেই অভিযোগ করছে। বন্যায় যাতে বাঁধ ভেঙে মানুষ ক্ষয়ক্ষতির শিকার না হয়, সেজন্যই আপৎকালীন প্রকল্পে এসব বাঁধ মেরামতের কাজ করা হচ্ছে।’

দিনাজপুরে মোট বাঁধের পরিমাণ ২০৮ কিলোমিটার। এরমধ্যে শহররক্ষা বাঁধ ২৭ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার। ২০১৭ সালের বন্যায় শহররক্ষা বাঁধের চারটি স্থানসহ ৫৮টি স্থানে ভেঙে প্লাবিত হয় দিনাজপুর।

 

 

/এমএএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম