ভারতের ফারাক্কা বাঁধের ১০৯টি লক গেট খুলে দেওয়ায় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে পদ্মা ও মহানন্দায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে রাজশাহী জেলার চরাঞ্চলের মানুষ গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে উঁচু জায়গায় নিরাপদ আশ্রয় নিচ্ছেন। অপরদিকে পদ্মার পানি রাজশাহীতে বিপদসীমা অতিক্রম করলেও ভয়ের কিছু নেই বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। দুর্যোগ মোকাবিলায় চারটি উপজেলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিয়ম করেছে জেলা প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট ও বাঘা উপজেলার চরাঞ্চলের বেশ কিছু মানুষ ইতোমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এছাড়া শহরের তালাইমারি এলাকার পদ্মাপাড়ের শহররক্ষা বাঁধের ভেতরের কিছু মানুষ পানিবন্দি আছেন।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ মিটার রিডার এনামুল হক জানান, মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) সকাল ৬টায় রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মায় পানির উচ্চতা ছিল ১৮.৪ মিটার। সন্ধ্যা ৬টায় ১৮.১০ মিটার। তিনি বলেন, ‘পদ্মার পানি বাড়লেও রাজশাহীবাসীর আপাতত ভয় নাই। পানি এখনও বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিপদসীমা ১৮.৫০ মিটার। তবে আমাদের শহররক্ষা বাঁধের উচ্চতা ১৯.৬৮ মিটার।’
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্যাদুর্গত এলাকায় ৫০৬ জনকে সহায়তা করা হয়েছে। পানি এখনও বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। সেই সঙ্গে আজ রোদ ওঠায় এখনও বন্যাদুর্গত এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়নি। তবে দুই-একদিনের মধ্যে পরিস্থিতি দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনিতে বানভাসি অনেক পরিবার উঁচু জায়গায় কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন। দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সবরকম প্রস্তুতি রয়েছে।’
পবা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকৌশলী আবু বাশির জানান, বন্যায় উপজেলার হরিপুর ও হরিয়ান ইউনিয়নের চরমাঝারদিয়াড়, চরনবীনগর, চরতারানগর, মধ্যচরের ৫৯৭টি পরিবার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে ৩৯১ পরিবারে ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বরাদ্দকৃত প্রায় ১১ টন চাল দু’একদিনের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
সোমবার হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গোদাগাড়ী উপজেলা চরআষারিয়াদহ ইউনিয়নের চরনওশেরা, হুমন্তনগর, নতুনপাড়া, আমতলা খাসমহল, বারিনগর, চরবয়ারমারী, চরবাসুদেবপুর ইউনিয়নের হাতনাবাদ, গোগ্রাম ইউনিয়নের নিমতলা, আলীপুর, দেওপাড়া ইউনিয়নের খরচাকা, মোল্লাপাড়া গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের বাড়িতে পানি প্রবেশ করায় বন্যার্ত মানুষ উঁচু জায়গা, স্কুল ও রাস্তার পাশে আশ্রয় নিচ্ছেন। তবে গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন।
গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষারিয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে পুরো ইউনিয়ন প্লাবিত হবে। বন্যায় সঠিক ক্ষতির পরিমাণ জানা না গেলেও ৭০ হেক্টর টমেটো, ৬০ হেক্টর মাসকলাই ও ২০ হেক্টর শাকসবজির জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফসল নষ্ট হয়েছে। নদীভাঙনের কারণে ৭৬টি বাড়িঘর পদ্মায় বিলীন হয়েছে এবং এসব মানুষ রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। ভাঙনের মুখে দিয়াড়মানিকচক বোয়ালমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাডসেন্টারসহ তিনটি গ্রামের দুই শতাধিক বাড়ি থেকে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছেন লোকজন।
গোদাগাড়ী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল আকতার বলেন, বন্যার্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকায় স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, মৎস্য অধিদফতরের টিম রয়েছে।
বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজিযুল আযম বলেন, পদ্মার চরের প্রায় এক হাজার ৮০০ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এছাড়া ৪ নম্বর ওয়ার্ড অন্য ওয়ার্ডের চেয়ে নিচু। ফলে পানি উঠেছে। চরের অধিকাংশ বাড়িতে পানি। কিছু কিছু বাড়ি ডুবেও গেছে। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।








