নওগাঁর রাণীনগরে কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না বাল্য বিয়ে। যতই দিন যাচ্ছে এলাকায় বাল্য বিয়ের সংখ্যা ততই বাড়ছে। কেবল গত ৯ মাসে উপজেলার মধুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ১০ জন, নবম শ্রেণির ৮ জন, অষ্টম শ্রেণির তিন জন ও সপ্তম শ্রণির তিন জন মেয়ের বাল্য বিয়ে হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছেন ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুর।
এই এলাকায় বাল্য বিয়ে বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রশাসনের গাফিলতি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতে বাল্য বিয়ের সঙ্গে জড়িদের কঠোর শাস্তি না দেওয়ার বিষয়টিকে দায়ী করছেন অনেকে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড জোরদার করলে বাল্য বিয়ে রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন সচেতন মহল।
রাণীনগর সরকারি শেরে বাংলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোফাখ্খার হোসেন খাঁন পথিক জানান,‘এই উপজেলার কালিগ্রাম ইউনিয়নের মধুপুর, ছাতারদীঘি, ছাতাপুকুর, অলংকারদীঘি, ভেটিগ্রাম ও পারইল ইউনিয়নের পারইল, বিশিয়াসহ এর আশেপাশের গ্রামগুলোতে সব চেয়ে বেশি বাল্য বিয়ে হচ্ছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এই এলাকার কোনও না কোনও গ্রামে বাল্য বিয়ের ঘটনা ঘটছেই। সম্প্রতি ছাতারদীঘি, ছাতারপুকুর ও মধুপুর গ্রামে চারটি মেয়ের বাল্য বিয়ে হয়েছে।
তিনি বলেন,‘প্রশাসন এসব ঘটনা জানতে পারলেও বিয়ের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর কোনও শাস্তি দেয় না, তারা বড়জোর অর্থদণ্ড ও জেলে পাঠান। কিন্তু এরকমের শাস্তি অভিযুক্তদের কাছে কিছুই নয়। সম্প্রতি ছাতারপুকুর ও ছাতারদিঘী গ্রামে বাল্য বিয়ে হচ্ছে, এমন খবর পেয়ে নির্বাহী কর্মকর্তা একটি বিয়ের আসর থেকে কাজি ও মেয়ের দুই মামাকে এনে অর্থদণ্ড দেন। কিন্তু পরদিনই ওই মেয়েকে পার্শ্ববর্তী আদমদীঘি উপজেলায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়।’
অধ্যক্ষ মোফাখ্খার হোসেন খাঁন পথিক আরও বলেন, ‘যতই দিন যাচ্ছে উপজেলাতে বাল্য বিয়ের ঘটনা ততই বাড়ছে। স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের উদাসীনতাও এর জন্য দায়ী। কারণ, বিয়ে রেজিস্ট্রি করার সময় বয়স প্রমাণের জন্য অবশ্যই ইউনিয়ন পরিষদের জন্ম সদন প্রয়োজন হয়। একটি মেয়ের বিয়ের বয়স না হলেও তারা কীভাবে জন্ম সনদ দেন। অথচ বাল্য বিয়ে রোধ করতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা উচিত। পাশাপাশি প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। শুধু অর্থদণ্ডই নয় বেশি বেশি করে সশ্রম কারাদণ্ড দিতে হবে, যেন আশেপাশের মানুষেরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। সর্বোপরি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষকে বাল্য বিয়ে সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।’
মধুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুর বলেন, ‘চলতি বছরে তার বিদ্যালয় থেকে দশম শ্রেণির ১০ জন, নবম শ্রেণির আট জন,অষ্টম শ্রেণির তিন জন ও সপ্তম শ্রণির তিন জন মেয়ের বাল্য বিয়ে হয়েছে। এই এলাকায় কোনোভাবেই বাল্য বিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রশাসন যদি বাল্য বিয়ের দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে দীর্ঘমেয়াদী জেল দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে,তা দেখে হয়তোবা অনেকেই সর্তক হবেন।’
রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, ‘বাল্য বিয়ে রোধে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। যখনই বাল্য বিয়ের খবর পাই, তখনই ছুটে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসছি। প্রশাসনের একার পক্ষে বাল্য বিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সমাজের সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে বাল্য বিয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।’ তবে প্রশাসন বাল্য বিয়ে রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি জানান।








