একাত্তরে অবরুদ্ধ ঢাকায় সংবাদপত্রগুলোর বেশিরভাগই নিজেদের চেহারা পাল্টে স্বাধীনতাবিরোধীদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। যারা তা পারেনি তাদের বন্ধ করে দিতে হয়েছে পত্রিকা। গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও সংবাদকর্মীরা বলছেন, ২৫ মার্চের পর একদিকে দেশপ্রেমিক সাংবাদিকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা প্রবল হয় আরেকদিকে নিজেদের মতো করে কাজ না করতে পারার ভয়াবহতায় কেউ কেউ ভারতে গিয়ে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন।এর বাইরে যারা ছিলেন তারা স্বাধীনতার পুরো সময়টি দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
এদের মধ্যে পূর্বদেশ পত্রিকাটির আচরণ ছিল গিরগিটিতুল্য। রং বদলে যুদ্ধে যখন মরিয়া দেশ তখন তারা ঘাস ফুল লতার খবর ছাপিয়েছে।আর জামায়াতের যাবতীয় বক্তৃতা বিবৃতির প্রকাশের মাধ্যমে মুখপত্রের জায়গা নিয়েছিল সংগ্রাম। আইনজীবীরা বলছেন, সংবাদপত্র যদি দালালের কাজ করে সেটা জাতির জন্য বড় দুর্ভাগ্য। আর এ কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাত্তরে রাজাকারদের দোসর হিসেবে কাজ করা পত্রিকাগুলোকেও যুদ্ধাপরাধে সমান দায় নিতে হবে বলে তার রায়ে জানিয়েছেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মার্চের প্রথম দিন থেকেই অগ্নিঝরা দিনগুলো নিয়ে দেশপ্রেমিক সাংবাদিকরা বিশেষ প্রতিবেদন/সম্পাদকীয়/উপ-সম্পাদকীয় লিখতে শুরু করেন। ২৫ মার্চ রাতেও সারাদিনের খবর প্রকাশের প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু মধ্যরাতে হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় সংবাদপত্রের কাজ। সেদিন রাতে থেকে কয়েকদিনের মধ্যে ৩টি পত্রিকায় সাংবাদিক ও কবি শহীদ সাবেরসহ আটকেপড়া কয়েকজন সংবাদকর্মী নির্মমভাবে নিহত হন।
মার্চের ১ তারিখ থেকেই ঢাকার প্রায় সবকটি সংবাদপত্রই স্বাধীনতার স্বপক্ষে বেশ সাহসী ভূমিকা পালন করে। কিছু দুঃসাহসিক ভূমিকার কারণে ২৫ মার্চ রাতেই পাক সেনারা গোলার আঘাতে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে ‘দি পিপল’ ভবন। পরদিন ২৬ মার্চ বিকেলে তারা হামলা চালিয়ে বিধ্বস্ত করে দৈনিক ইত্তেফাক ভবনের একাংশ। বর্বর সেনারা ইত্তেফাকের ছাপাখানায় আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ৩০ মার্চ পাক সেনারা আরেক সাহসী ভূমিকা রাখা পত্রিকা ‘সংবাদ’ অফিসে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে হত্যার প্রসঙ্গে তার ছেলে সুমন জাহিদ বলেন, মা একাত্তরে বিখ্যাত সাংবাদিক ছিলেন না, তারপরও তিনি আলবদরদের হাতে নিহত হয়েছেন কারণ তার প্রকাশিত শিলালিপিতে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত কবি, সাহিত্যিকেরা লিখতেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হান, আ ন ম গোলাম মোস্তফা প্রমুখ। ঠিক একইভাবে সাংবাদিক সিরাজুল হোসেনকে ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি আর্মি ও তাদের দোসররা। এরপর আর ফেরেননি প্রথিতযশা এ সাংবাদিক, যিনি যুদ্ধের পুরো সময়টা লিখে গেছেন মুক্তির পক্ষে।
১৯৭১ সালের পূর্বদেশ পত্রিকা দেখলে দেখা যায় বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তেও তারা দেদারসে ‘দুষ্কৃতিকারীদের’ ধরিয়ে দিতে সাহায্য করতে কত করে টাকা দেওয়া হবে তার বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছে। এছাড়া ৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতীয় বিমান বাহিনীর দুজন পাইলটকে আটক করেছে। সেই পাইলটদের তল্লাশির সময় তাদের কাছে বাংলাদেশের একটা পতাকা পাওয়া যায়। সে খবরে তারা বলছে, তাদের কাছে তথাকথিত বাঙলা দেশ-এর পতাকা ছিল। অথচ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের পর তাদের রঙ বদলাতে এক মাসও লাগেনি।
এবিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাহীদুর রহমান বলেন, একেকটা সময়কে ধরে রাখার দায়িত্ব গণমাধ্যমের। তারা যখন মিথ্যা কথা বলে বা সত্যটা চেপে রাখে তখন তারা দণ্ডনীয় অপরাধই করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কাজ করতে গিয়ে পূর্বদেশ সংগ্রামসহ বেশকিছু পত্রিকার যে ভূমিকা দেখেছি সেটা অমার্জনীয় অপরাধ। যাদের প্রতি জাতিকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব থাকে তারা যদি দালালের জায়গায় অধিষ্ঠিত হয় তাহলে সেটা জাতির জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।
তিনি আরও বলেন, এসব বিবেচনায় একাত্তরে রাজাকারদের দোসর হিসেবে কাজ করা পত্রিকাগুলোকেও যুদ্ধাপরাধে সমান দায় নিতে হবে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায়ে জানিয়েছেন।
ছবি: আরিফ হোসেন, সংগৃহীত
/এফএ/টিএন/
আপ-এসটি








