শনিবার (১২ই ডিসেম্বর) পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতু প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপনের প্রায় ১৪ বছর পর মূল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করছেন তিনি।
মাওয়া ঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর উপরে ৭ নম্বর পিলারে মূল পাইলিং শুরু হবে। এটিই হবে সেতুর প্রথম মূল পাইল ড্রাইভিং। আগামী ১২ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী এখান থেকেই সেতুর মূল পাইলিং উদ্বোধন করবেন। ওইদিন জাজিরা প্রান্তে নদী শাসনের কাজও উদ্বোধন করবেন তিনি।
মূল সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদের জানান, মাওয়া প্রান্ত থেকে দূরে পদ্মার ওপর ৭ নম্বর পিলারে পাইল ড্রাইভ করা হবে। মাওয়া ও জাজিরার মধ্যে পদ্মা নদীতে ৭ নম্বর পিলারে উদ্বোধন মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পাঁচ হাজার স্থায়ী জনবলসহ ২০ হাজারের বেশি লোক পদ্মা সেতু নির্মাণে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। দ্বিতল সেতুটি কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে নির্মাণ করা হবে। ওপর তলায় গাড়ি চলাচল করবে, আর নিচতলায় ট্রেন।
২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই বিশাল সেতুর নির্মাণ কাজ ২০১৮ সালের মধ্যেই শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এই সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ২১ জেলার সঙ্গে ঢাকাসহ সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
যেভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে স্বপ্নের সেতু:
মূল সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদের জানান, সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবিধার্থে সমস্ত কর্মপ্রক্রিয়াকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে কাজ চলছে। চলছে সেতুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য রাস্তা নির্মাণ, মাটি পরীক্ষা, নদীর ওপর প্লাটফর্ম নির্মাণ, পাইল তৈরিসহ বিভিন্ন কাজকর্ম। পাশাপাশি চলছে ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কাজ।
এছাড়া নদী তীর থেকে বিশাল ক্রেনের মাধ্যমে মালপত্র ওঠানামার কাজ চলছে। পদ্মা নদীর দুই পারে সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। সড়কটি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মেদিনীমণ্ডল ও কুমারভোগ এই দুই ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে গেছে।
অন্যপ্রান্তে শরিয়তপুর জেলার জাজিরা থানার নাওডোবা ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে চার লেনের সাড়ে ১০ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ চলছে। এদিকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার মাওয়ার সংযোগ সড়ক তৈরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি। একইসঙ্গে তৈরি হচ্ছে টোল বুথ, কালভার্টসহ অন্যান্য অবকাঠামো।
মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন কোম্পানি। এছাড়া অন্যান্য প্রকল্পে কাজ করছে আলাদা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার শর্তে সংযোগ সড়ক ও টোল প্লাজা নির্মাণ কাজ করছে যৌথভাবে আবদুল মোনেম নিমিটেড ও মালয়েশিয়ার এইচসিএম নামের দু’টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের সার্বিক কাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ কোরীয় প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে।
মোট ২৬৪টি পাইল:
মূল সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদের জানান, পদ্মা সেতু দাঁড়াবে ৪২টি পিলারের ওপর, এরমধ্যে ৪০টি পানির ওপর এবং ২টি নদীর তীরে । সেতুর উভয় প্রান্তে তিন কিলোমিটার সংযোগ সেতুর ২৪টি পাইল হবে। মূল সেতুর ৪০টি পিলারে ছয়টি করে ২৪০টি এবং দুই পারের দুটিতে ১২টি করে ২৪টিসহ মোট ২৬৪টি পাইল করতে হবে। ১৫০ মিটার পরপর পিলার বসানো হবে।
ইতোমধ্যে চারটি ট্রায়াল পাইল এবং একটি কন্সট্রাকশন ট্রায়াল পাইল বসানো হয়ে গেছে। আর ১২ ডিসেম্বরে শুরু হচ্ছে মূল ট্রায়াল পাইল। প্রকৌশলী বলেন, সূক্ষ্ম পরিমাপের জন্য একটি ‘লেভেল মেশিন’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যেন প্রত্যেকটি পাইল সঠিক দূরত্বে বসানো যায়।
সেতুর ব্যয়:
পদ্মা সেতু প্রকল্পের মোট ব্যয় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা হলেও মূল সেতু তৈরিতে ব্যয় হবে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। নদী শাসনে ব্যয় হবে আট হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা এবং অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে সাত হাজার ১৫২ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
নদী শাসন:
জানা গেছে, নদী শাসন করা হবে ১৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার। মাওয়া অংশে ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার, জাজিরা অংশে হবে ১২ কিলোমিটার। চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন এ কাজ করছে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ:
ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন কাজও সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৯৫ ভাগ।এ বিষয়ে পদ্মা সেতু পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে যশলদিয়া ও কুমারভোগ পুনর্বাসন প্রকল্প ও অতিরিক্ত আরও ২টি পুনর্বাসন কেন্দ্রের জন্য ৩০ দশমিক ৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে সর্বমোট ৯৯৮টি প্লট তৈরি করা হয়েছে। ৬৫০টি প্লট ইতোমধ্যে ভূমির মালিকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকিগুলো বিতরণের কাজ প্রক্রিয়াধীন।
ক্ষতিপূরণের টাকায় হজ পালন:
মাওয়ার কুমারভোগে পদ্মা বহুমুখী পুনর্বাসন কেন্দ্রের নাম রাখা হয়েছে হাজিপাড়া। পদ্মাসেতু প্রকল্পের পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা হাজী ফয়জুল মোড়ল (৬৫) জানান, ‘প্রকল্পের কাজে দিয়েছি বাপদাদার ৪০ শতক জমি। ক্ষতিপূরণ হিসাবে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পেয়েছি ৭ শতক জমি ও ৫০ লাখ টাকা। সেই টাকা দিয়ে আমি, আমার স্ত্রী আছিয়া বেগম, বড় বোন মাকছুদা খাতুন ও মা হালিমা খাতুন ১৩ লাখ টাকা খরচ করে হজ করে এসেছি।’
ক্ষতিপূরণের টাকায় হজ করে এসেছেন আরও অনেকে। কথা হয় মো. আব্দুর রাজ্জাক, শুকুর হাওলাদার, আদেল শেখ, আবু বকর, ঈমান আলী, আব্দুল খালেক ও আর্শেদ আলীর ও সৈয়দ মিয়ার সঙ্গে। তারা সবাই হজ করে এসেছেন। ফয়জুল মোড়ল বলেন, ‘কয়জনের নাম বলবো। কয়েক ঘর বাদে সবাই এখন হাজি। পদ্মাসেতুর কারণে এটা হয়ে গেছে হাজিপাড়া।’
মো. দাদন তালুকদার জানান, তার ৪৫ শতক জমি ও বাড়ির বিনিময়ে এখানে ৭ শতক জমি ও ৬০ লাখ টাকা পেয়েছেন। সাত শতক জমির উপর নির্মাণ করছেন দুইতলা পাকা দালান। তবে জমি এখনও তার নামে নিবন্ধিত হয়নি।
তবে পদ্মা সেতু প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের টাকা পাননি অনেকেই। জমি অধিগ্রহণের পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্লটও জোটেনি কারও কারও। লৌহজং উপজেলার দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল গ্রামের বাসিন্দা মঙ্গল শেখ বলেন, তার ৬১ শতাংশ জমি পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে। শতাংশ প্রতি সরকার টাকা দিচ্ছে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। সেই মোতাবেক সব মিলিয়ে জমি অধিগ্রহণ বাবদ মঙ্গল শেখ পাবেন এক কোটি ২৫ লাখ টাকার ওপরে। টাকা পেয়ে থাকলেও এখনও পর্যন্ত তিনি প্লট পাননি।
মঙ্গল শেখের মত আরও অনেকেই পদ্মা সেতুর জমি অধিগ্রহণের প্লট পাননি। এমন আক্ষেপ দক্ষিণ মেদেনীমণ্ডল গ্রামের জুলেখা বেগমসহ আরও অনেকেরই। জমি অধিগ্রহণের পর সরকারঘোষিত টাকা পেলেও প্লট বুঝে পাননি তারা।
মাওয়ায় উৎসব মুখর পরিবেশ, ব্যাপক প্রস্তুতি:
মাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। জনসমাবেশকে সফল করতে আড়াই লাখ লোক সমাগমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে মুন্সীগঞ্জের প্রতিটি থানা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও পাড়া মহল্লায় নেতা কর্মীদের নিয়ে দফায় দফায় সভা-সমাবেশ, পোস্টারিং চলছে। সব কিছু মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এ বিশাল আয়োজনের দেখাশোনা করছেন। তিনি জানান, পদ্মা সেতু প্রধানমন্ত্রীর একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর সে চ্যালেঞ্জ সফল হতে যাচ্ছে। শুধু বিক্রমপুরের মানুষই নয়। প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে ছুটে আসবে পদ্মার ওপারের মানুষও।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রায় প্রতিদিনই প্রকল্প এলাকায় যাচ্ছেন। প্রকল্প পরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তারাও ব্যস্ত সময় পার করছেন বলে জানালেন প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম।
/এইচকে/এফএস/








