গ্রাহকদের স্বাক্ষর জাল করে ৭৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক জামালপুরের মেলান্দহ বাজার শাখার কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমানকে জেল হাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। সোমবার রাতে ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অভিযুক্ত মাসুদুরকে পুলিশে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক মেলান্দহ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, দুবাই প্রবাসী প্রবীণ ব্যক্তি মো. রফিকুল ইসলামের একটি সঞ্চয়ী হিসাব রয়েছে মেলান্দহ বাজার শাখা কৃষি ব্যাংকে। তিনি রবিবার সকালে কৃষি ব্যাংকের জামালপুর শাখায় গিয়ে তার ওই হিসাবে মোট কত টাকা জমা আছে জানতে চান। ব্যাংক থেকে তাকে জানানো হয় তার হিসাবে কোনও টাকা জমা নেই। তিনি তখন দাবি করেন, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী তার ২১ লাখ টাকা জমা ছিল। অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকার বিষয়টি জানতে পেরে একই দিন তিনি বেলা ২টার দিকে মেলান্দহ বাজার শাখা কৃষি ব্যাংকে গিয়ে তা লিখিতভাবে ব্যবস্থাপককে অবহিত করেন। এসময় শাখা ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম ব্যাংকের দ্বিতীয় কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানের কাছে জানতে চান গ্রাহক রফিকুল ইসলামের হিসাব শূন্য কেন। তিনি কোনও সদুত্তর না দিতে পারায় তাৎক্ষণিক তাকে ব্যাংকের স্টোর রুমে আটক রেখে আরও বেশ কয়েকজন গ্রাহকের হিসাবে টাকার বড় অঙ্কের গড়মিল ধরা পড়ে।
বিষয়টি কৃষি ব্যাংকের ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ে অবহিত করা হলে সোমবার বিকালে বিভাগীয় মহাব্যবস্থাপক মো. দিদারুল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে চার সদস্যদের একটি টিম মেলান্দহে পৌঁছে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত কাজ শুরু করেন। প্রাথমিক তদন্তে টাকা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যাংকটির দ্বিতীয় কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তারা। মাসুদুর রহমান অনলাইনে বেশ কয়েকজন গ্রাহকের হিসাব থেকে প্রায় ৭০ লাখ টাকা অন্য কোনও ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন বলে নিশ্চিত হন কর্মকর্তারা।
ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২১ লাখ টাকা খোয়ানো ভুক্তভোগী গ্রাহক রফিকুল ইসলাম তদন্ত টিমের কাছে অভিযোগ করে তার টাকা ফেরত চেয়েছেন। গ্রাহক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার হিসাবে ২১ লাখ টাকা জমা ছিল। এরপর আর টাকা জমা দেই নাই। টাকা তুলিও নাই। তাহলে আমার এতগুলো টাকা গেলো কোথায়। আমি আমার টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছি।’
অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম টাকা আত্মসাতের বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্বিতীয় কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানকে ব্যাংকের স্টোর রুমে আটক রাখলেও তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি ব্যাংকটির আরেক গ্রাহক মেলান্দহের স্থানীয় ঠিকাদার মো. রোকনুজ্জামান চৌধুরীকে রবিবার রাতে ব্যাংকে ডেকে নিয়ে ধার হিসেবে ১৮ লাখ টাকার একটি চেক লিখে নেন। চেকটি দেওয়া হয় দ্বিতীয় কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানের নামে। সোমবার টাকা ফেরত দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এরমধ্যেই ব্যবসায়ী রোকনুজ্জামান চৌধুরী সোমবার সকালে রফিকুল ইসলামের হিসাবে ২১ লাখ টাকা না থাকাসহ বেশ কয়েকজন গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা গায়েবের বিষয়টি জানতে পারেন। তখন রোকনুজ্জামান চৌধুরী বুঝতে পারেন যে, তার কাছ থেকে ১৮ লাখ টাকার চেক ধার হিসেবে নিয়ে অন্য গ্রাহকের টাকা আত্মসাতকারী মাসুদুর রহমানকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এরপর রোকনুজ্জামান চৌধুরী সোমবার বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত চেষ্টা করেও তার ১৮ লাখ টাকার চেকটি ফেরত পাননি।
রোকনুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ব্যবস্থাপক অন্য গ্রাহকের চুরি করা টাকার হিসাব মেলাবেন তা আমি রবিবার রাতে বুঝতে পারিনি। আমার ১৮ লাখ টাকার চেকটি ফেরত চেয়েছি।’
ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি না। টাকা আত্মসাতকারী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানের তো শাস্তি হবেই। প্রাথমিকভাবে ১১ জন গ্রাহকের মোট ৭৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই টাকাগুলো জেলার দেওয়ানগঞ্জ ও ঢাকার পাঁচটি ব্যাংকের পাঁচটি অ্যাকাউন্টে অনলাইনে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করা হয়। এজন্য থানায় মামলা দিয়ে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।’ তবে গ্রাহক রোকনুজ্জামান চৌধুরীর কাছ থেকে ১৮ লাখ টাকা ধার নেওয়া বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ময়মনসিংহ বিভাগীয় মহাব্যবস্থাপক দিদারুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘কৃষি ব্যাংকের মেলান্দহ বাজার শাখার দ্বিতীয় কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি ব্যাংকের গ্রাহকদের হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন বলে ধারণা পাওয়া গেছে। তার কথা এখনই বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। টাকার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। কতজন গ্রাহকের টাকা সরিয়ে কোথায় জমা রাখা হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। আপাতত ব্যাংকের পক্ষ থেকে মেলান্দহ থানায় একটি মামলা দায়ের করে অভিযুক্ত মাসুদুর রহমানকে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও অডিট টিম তদন্ত করবেন। এরপর জানা যাবে কতজন গ্রাহকের হিসাব থেকে মোট কত টাকা সরানো হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের কোনও কর্মকর্তার অপকর্মের দায়ভার গ্রাহক বহন করতে যাবে কেন। তাই গ্রাহকদের টাকাগুলোও কীভাবে ফেরত দেওয়া যায়, আমরা সেই দিকটাও মাথায় রেখে কাজ করছি।’
মেলান্দহ থানার ওসি রেজাউল ইসলাম খান বলেছেন, সোমবার রাতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক মেলান্দহ শাখার ব্যবস্থাপক ৭৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগটি দুদক এর সিডিউলভুক্ত হওয়ায় জিডি হিসেবে গ্রহণ করেন আসামিকে আাদালতে প্রেরণ এবং অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণের জন্য দুদক টাঙ্গাইল সমন্বতি জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।








