রোহিঙ্গাদের বোঝাতে ‘ব্যর্থ’ মিয়ানমার

টেকনাফ ও কক্সবাজার প্রতিনিধি
১৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:০৭আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:০৩

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের বৈঠক প্রত্যাবাসনের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের বোঝাতে তৃতীয়বারের মতো কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছেন মিয়ানমারের ৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। তাদের সঙ্গে রয়েছে আসিয়ানের আরও সাত সদস্য। বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) দুপুরে উখিয়ার এক্সটেনশন ক্যাম্প ৪-এ রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে সংলাপ করেন তারা। তবে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরতে রাজি করাতে পারেনি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। রোহিঙ্গারা বলছেন, বৈঠকে পুরনো ক্যাসেট নতুন করে বাজিয়ে শুনিয়েছে মিয়ানমার।

প্রতিনিধি দলটি রোহিঙ্গাদের বলছে, ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে। কিন্তু রোহিঙ্গারা তা প্রত্যাখান করে বলেছেন, রাখাইনে পূর্ণ নাগরিকতাসহ নানা সুযোগ সুবিধা দিলেই ফিরবেন তারা, এর আগে নয়।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক বিভাগের মহাপরিচালক সিন আয়ের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি ৪৭ জন রোহিঙ্গার সঙ্গে ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মাহবুব আলম তালুকদারসহ জেলা প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক বিকেল ৪টার দিকে শেষ হয়।

বৈঠক উপস্থিত কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, নাগরিক অধিকার, ভিটেমাটি ফেরত ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারেননি মিয়ানমারের কর্মকর্তারা। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরতে আহ্বান জানানো হলেও দাবি পূরণের আশ্বাস ছিল না। পুরনো কথা শোনানো হয়েছে কেবল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) এক নেতা বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর এখনও নির্যাতন চালাচ্ছে সেনারা। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে নেই তাদের। এ বৈঠক মিয়ানমারের লোক দেখানো মাত্র। বৈঠকে আমাদের দাবি ছিল, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, কেড়ে নেওয়া জমি ফেরত ও নিরাপত্তার নিশ্চিয়তা দিতে হবে। পাশাপাশি ফেরার আগে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দল রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি দেখতে যেতে চায়। কিন্তু মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের কথায় আমরা কেউই সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আগামীকাল বৈঠকে কী হয় দেখা যাক।’

বৈঠকে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন চালিয়ে আসছে মিয়ানমার সরকার। আমরা এখন তাদের আর বিশ্বাস করতে পারি না। তাই আমরা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কথা বলেছি বৈঠকে।’

রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার সিরাজ আহমদ বলেছেন, ‘এটি মিয়ানমারের নাটক। আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলাকে ভিন্নখাতে নিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলাকে কৌশল হিসেবে নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো ছাড়া আমি কিছুই দেখছি না।’

বৈঠকে অংশ নেয়া রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মুহিব উল্লাহ জানিয়েছেন, ‘মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটি সেই পুরনো কথাগুলো বার বার বলছেন। এনভিসি কার্ড নিয়ে আমরা কোনোভাবেই মিয়ানমারে ফিরবো না। এ কথা জানানোর পরও দীর্ঘদিন পরে এসে সেই পুরনো কথা নতুন করে শুরু করছেন তারা। সংলাপে নতুনত্ব বলতে কিছুই নেই।’

রোহিঙ্গা নারী নেত্রী জামালিদা বেগম বলেন, ‘রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছি না মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলকে। তারা রাখাইনে সহিংস কোনও ঘটনা শুনতে রাজি নন। বলছেন, তোমরা (রোহিঙ্গারা) প্রথমে এনভিসি কার্ড নাও, পরে পূর্ণ নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু এনভিসি কার্ডের মধ্যে নানা শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।'

প্রতিনিধি দলের প্রধান মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থনীতি বিভাগের পরিচালক সিন আয়ে বলেন, ‘প্রত্যাবাসন ইস্যুতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা চালু থাকবে।’

প্রতিনিধি দলটি কক্সবাজার অবস্থান করছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবারও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরেক দফায় বৈঠক করার কথা রয়েছে এই দলের সদস্যদের।

ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত) শামসুদ্দৌজা নয়ন বলেন, ‘বৈঠকে রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়েছে। এ সময় রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ তাদের দাবি তুলে ধরেন। এতে মিয়ানমার প্রতিনিধি দল জানান, নাগরিকত্ব বিষয়ে রোহিঙ্গারা বৈধ কাগজপত্র নিয়ে আবেদন করলে বিবেচনা করা হবে। এছাড়া রোহিঙ্গারা জাতিসংঘের মাধ্যমে নিরাপত্তার দাবি তুললে তা মেনে নিতে অস্বীকার করেন প্রতিনিধিরা। তারা  বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার আশ্বাস দেন।’

এর আগে চলতি বছরের ২৭ জুলাই মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে’র নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করেন। এ সময় আসিয়ানের প্রতিনিধি দলটিও সঙ্গে ছিল। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে রোহিঙ্গাদের যৌথ সংলাপে অংশ নেন তারা।

এছাড়াও ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী উইন মিয়াট আয়ে’র নেতৃত্বে আরও একটি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলতে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসেছিলেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের ৩০টি নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন শুরু করে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে অন্তত সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাসহ উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭ জন।

/এফএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম