কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এমপি বলেছেন, ‘দেশের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমানে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এখন শুধু প্রয়োজন সুশাসন নিশ্চিত করা। দেশের কৃষি বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাজারে সুশাসনের অভাব রয়েছে বলেই দেশে পেঁয়াজের দাম এতোটা বেড়েছে।’
সোমবার (৬ জানুয়ারি) গাজীপুরের জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত ‘কৃষক-উদ্যোগ: বাণিজ্যিক কৃষির উদীয়মান চালক’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘পেঁয়াজ পচনশীল দ্রব্য। গতবছর পেঁয়াজ জমি থেকে ঘরে তুলে আনার আগে অস্বাভাবিক বৃষ্টির কারণে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অথচ আমাদের মার্কেটিং এবং এগ্রিকালচার এক্সটেনশন ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। বৃষ্টির কারণে দেশে পেঁয়াজের কী পরিমাণ উৎপাদন কম হয়েছে বা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার হিসেব ওই দুই ডিপার্টমেন্টে সমন্বয় করে নির্ণয় করা উচিত ছিল। অথচ তারা তা করেনি। নিজেদের মধ্যে সমম্বয়ের অভাবের কারণেই এটা হয়নি। যদি ওই হিসেব থাকতো তাহলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা যেতো। এদিকে ভারত থেকে যে পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করার কথা ছিল, ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে তা আমরা করতে পরিনি। দেশে পেঁয়াজের মৌসুমে বাল্ব লাগিয়ে প্রায় দুই লাখ টন গুটি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়ে থাকে। বাকি ২৩/২৪ লাখ টন হয় মূল সিজনে, বীজ থেকে চারা উৎপাদনের মাধ্যমে। পেঁয়াজের দাম বেশি থাকায় কৃষকরা এ মৌসুমে পাতাসহ গুটি পিয়াজ বিক্রি করায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাই পেঁয়াজের দাম কমছে না। আমরা পেঁয়াজে আমদানির জন্য প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দেশের দ্বারস্থ হচ্ছি। এতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা কোথায়?’
‘ধান চাষিদের কাছে যেতে পারিনি’
তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে গত প্রায় এক বছরে আমরা ধান চাষিদের কাছে যেতে পারি নাই। আমরা বার বার বলছি ধান ও চাল রফতানির উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য ইনসেনটিভ (প্রণোদনা) প্রয়োজন। সরকার কৃষিপণ্য রফতানিতে ২০ ভাগ ইনসেনটিভ দেয়। কিন্তু কৃষিপণ্যের ফসলের ওই তালিকায় ধান বা চালের কথা উল্লেখ নেই। ফলে আজ যদি কেউ চাল রফতানি করে তাহলে সে ওই ইনটেনসিভ পাবে না। মন্ত্রী হয়েও আমি গত ৮/৯ মাসে চালকে ২০ভাগ ইনটেনসিভ দেওয়ার তালিকাভুক্ত করতে পারিনি সমন্বয়ের অভাবের কারণে। ফলে ধান আবাদ করে চাষিরা লাভবান হচ্ছে না।’
কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ করতে হবে
কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ করতে হবে। এখান থেকে পেছনে ফিরে যাওয়ার কোনও পথ নেই। এতে কৃষকরা তাদের ক্ষতি পুষিয়ে লাভবান হতে পারবেন। আমরা নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে চাই। এ জন্য কৃষির ওপর আমরা গুরুত্ব আরোপ করেছি। আমরা যদি সবাই আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করি, তবে সব ক্ষেত্রেই উন্নতি ও সু-শাসন নিশ্চিত করতে পারবো।’
তিনি বলেন, ‘কৃষিকে এগিয়ে নিতে আমরা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের একটি নীতিমালা করেছি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের আওতায় একটি এগ্রিকালচার ইঞ্জিনিয়ারিং উইং করতে চাচ্ছি। এটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে। আমি যেভাবে চাচ্ছি সেভাবে হচ্ছে না। যান্ত্রিকীকরণের বিষয়টি আগামীকাল মন্ত্রণালয়ের সভায় উঠবে। এ ব্যাপারে ভর্তুকি দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অর্থ বরাদ্ধ চাওয়া হয়েছে। কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করা হলে উৎপাদন খরচ কম হবে। চাষাবাদ করে কৃষকরা লাভবান হবে।’
বাজার মনিটরিং
মন্ত্রী মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা কমচারীদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আপনারা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজার প্রতিদিন মনিটর করে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য দেখে পার্থক্যের তালিকা ও কারণ সমূহ নির্ণয় করে আমাকে দেবেন। দেশে কোন শস্য কী পরিমাণ উৎপাদন হয়েছে, কী পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে, কী পরিমাণ আমদানি করতে হবে তা-ও জানতে হবে। প্রয়োজনে ব্যবসায়ীরা যেসব মহলে চাঁদা দেন সেসব তালিকাও আমাকে জানাবেন। আমি এ ব্যাপার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কথা বলে ব্যবস্থা নেবো।’
তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী কৃষকদরদি ও কৃষকবান্ধব। দেশে ৭/৮ লাখ টন ডিএপি সার লাগে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তিনি টিএসপি সারের দাম ২৫ টাকা থেকে ১৬ টাকায় নামিয়ে এনেছেন। এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। কৃষদের জন্য এটি তার বিজয় দিবসের উপহার। এখন কৃষি ও কৃষি বিপণন ক্ষেত্রে সু-শাসন কায়েম করতে হবে। বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে বাজারে সুশাসন আনা আমাদের দায়িত্ব।’
মাশরুম চাষ লাভজনক করতে হবে
কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দেশে মাশরুমকে লাভজনক করার জন্য মাশরুম সেন্টারকে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশে কেন ব্যাপকভাবে মাশরুমের চাষ হচ্ছে না, মাশরুম রফতারি করতে কী কী সমস্যা হচ্ছে, সেসব সমস্যা চিহ্নিত করে তা দূর করার উপায়গুলো মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হবে। নতুবা দেশে মাশরুম সেন্টার থাকার কোনও প্রয়োজন নেই।’
জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. আবু সাইদ মিঞার সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইমেরিটাস প্রফেসর ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. এম এ সাত্তার মন্ডল। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরউজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মান্নান আকন্দ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মুঈদ, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির উপ-পরিচালক ড. মো. সাইদুর রহমান, সিনিয়র সহকারী পরিচালক শারমিন আক্তার প্রমুখ।








