১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে সাড়া দিয়ে নড়াইলের মুক্তিপাগল জনতা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা নড়াইলের এসডিও’র বাসভবনকে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের হাই কমান্ডের সদর দপ্তর ঘোষণা করে।
এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে তৎকালীন নড়াইলের এসডিও কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, এমএনএ খন্দকার আব্দুল হাফিজ, আওয়ামী লীগ নেতা এখলাছ উদ্দিন লোহাগড়া হাই স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও নড়াইলের সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের এক করে বিশাল এক বাহিনী যশোর অভিমুখে পাঠিয়ে দেন। ৬ এপ্রিল সকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দুটি জেট বিমান থেকে নড়াইল শহরের ওপর ব্যাপক গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করলে শহর জনশূন্য হয়ে পড়ে। ১৩ এপ্রিল হানাদার বাহিনীর একটি দল নড়াইল শহরের চৌরাস্তায় রেস্টুরেন্ট মালিক মন্টুকে গুলি করে আহত করে এবং হরিপদ সরদার, ভাটিয়া গ্রামের কালু বোস, সরসপুর গ্রামের প্রফুল্য মিত্রকে ধরে নিয়ে দাইতলা পুলের নিকট গুলি করে ফেলে রেখে চলে যায়।
ওই সময় নড়াইলের জামায়াত নেতা শান্তি কমিটির সভাপতি মওলানা সোলায়মান এবং সেক্রেটারি হারুন মোক্তারের নেতৃত্বে শান্তি বাহিনী গঠিত হয়। এদের নির্দেশে কয়েক হাজার মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে জবাই করে হত্যা করে। ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকেই নবগঙ্গা নদীর উত্তর ও পূর্বাঞ্চাল হানাদার মুক্ত হয়ে যায়।
লোহাগড়া থানায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘাঁটিকে ৬ ডিসেম্বরের মধ্যে মুক্তি বাহিনীর কমান্ডাররা আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলে তারা আত্মসমর্পণ না করায় ৭ ডিসেম্বর শরীফ খসরুজ্জামান, দবির উদ্দিন, ইউনুস আহমেদ, লুৎফর মাস্টার, আলী মিয়া, লুৎফর বিশ্বাসসহ অনেক গ্রুপ একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে তিন দিক থেকে লোহাগড়া থানা আক্রমণ করলে প্রচন্ড যুদ্ধের পর হানাদার বাহিনী ৮ ডিসেম্বর অত্মসমর্পন করে। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা নড়াইলে হানাদার বাহিনীর ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
৮ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী এস এম ফজলুর রহমান জিন্নাহ’র নেতৃত্বে নড়াইল কলেজের দক্ষিণে মাছিমদিয়া গ্রামে সমবেত হয়ে পুলিশ-রাজাকারদের উপর অতর্কিত হামলা চালালে এই যুদ্ধে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা জয়পুরের মিজানুর রহমান হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। মিজানুর রহমানের মৃতদেহ হানাদার বাহিনীর দোসররা হাত-পা বেঁধে বাঁশে ঝুলিয়ে নড়াইল শহর প্রদক্ষিণ করে।
৯ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফজলুর রহমান জিন্নাহ, আমির হোসেন, উজির আলী, শরীফ হুমায়ুন কবীর, আঃ হাই বিশ্বাসের নেতৃত্বে বর্তমান নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমন চালালে পাল্টা আক্রমনে বাগডাঙ্গা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান শহীদ হন।
এসময় মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা চতুর্দিক থেকে প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু করলে পাকিস্তানি মিলিটারিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এখানে কয়েকজন মিলিটারি নিহত হয় এবং অন্যদের আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়। শীতের রাতে প্রবল শীতকে উপেক্ষা করে মুক্তিযোদ্ধারা সারা রাত শহরে বিজয় উল্লাস করতে থাকেন ও জয় বাংলা শ্লোগানে শহর প্রকম্পিত করে তোলেন এবং ১০ ডিসেম্বর নড়াইলকে পাক হানাদার মুক্ত ঘোষণা করা হয়।
দিবসটি পালন উপলক্ষে নড়াইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিট, চিত্রা থিয়েটারসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
/এফএস/








