হাসপাতালের সামনে সিটি করপোরেশনের ময়লার ভাগাড়

জাকিয়া আহমেদ ও চৌধুরী আকবর হোসেন
১৩ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৫:২৫আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৮:৫৪
image

Hospital-4  

প্রায় ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে ময়লার স্তূপ মোহাম্মদপুরের ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং ১০০ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এই ময়লার স্তূপ সরাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনে আবেদন জানিয়ে আসছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে এ আবেদনে হিতে বিপরীত হওয়ার দশা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। ময়লার স্তূপ না সরিয়ে বরং হাসপাতালের গেটের সামনেই স্থায়ীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন বানাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথমে প্রায় ১ হাজার স্কয়ার ফিট আয়তনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনা নিয়ে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ৬০ শতাংশ কাজ শেষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের আয়তন বাড়িয়ে ১৫শ’ স্কয়ার ফুট করার জন্য পেছনের অংশ ভেঙে এখন হাসপাতালের দিকে এর পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিকল্প কোনও স্থান খুঁজে না পাওয়ার কারণে হাসপাতালের সামনেই সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনটি বানানো হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই মোহাম্মদপুরের ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং ১০০ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে আশেপাশের এলাকার ময়লা এনে জমা করে রাখে স্থানীয় বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। সেখান থেকে জমা করা আবর্জনা সিটি করপোরেশনের গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে সারাদিনেই হাসপাতালের গেটে পড়ে থাকে ময়লার স্তূপ, লেগে থাকে ময়লার গাড়ির জটলা। তবে হাসপাতালের সামনে থেকে ময়লার স্তূপ সরাতে বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সংসদ সদস্যকে লিখিত আবেদন করেছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

Hospital-3

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারটি নির্মিত হয় । ১০০ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতাল চালু করা হয় ২০১০ সালে। এখানে পরিবার পরিকল্পনা সেবা, শিশুদের টিকাদান, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, সন্তান প্রসবসহ মা ও শিশুদের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের গেটের সামনে স্তূপ করে ময়লা জমা করছে স্থানীয় বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের সংগ্রহ করা আবর্জনা সিটি করপোরেশনের গাড়িতে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে সারাক্ষণ হাসপাতালের সামনভাগ, ভেতর ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে থাকে আবর্জনার দুর্গন্ধ। অসুস্থ রোগীরা বাধ্য হয়ে নাক চেপে প্রবেশ করেন হাসপাতালে। ময়লার সংগ্রহের কাজে থাকা ভ্যানগাড়ির জটলা সারাদিনই লেগে থাকে হাসপাতালের গেটে।

জানা গেছে, উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের নির্বাচনি ইশতেহার ছিল ময়লা, আবর্জনা, দুর্গন্ধ থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে পর্যায়ক্রমে সড়ক থেকে ময়লার ডাস্টবিন সরিয়ে নেওয়া হবে। এর বদলে এলাকাভিত্তিক ময়লা সংরক্ষণ (ডাম্প) কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। আনিসুল হক দায়িত্ব নেওয়ার আগে উত্তরে এলাকাভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জন্য ১৪টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন ছিল।

উত্তর সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, আনিসুল হক দায়িত্ব নেওয়ার পর উত্তরের ৩৬টি ওয়ার্ডে ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে ২০টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের কাজ চলমান। ২০১৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ৫০টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। ন্যূনতম ২ হাজার স্কয়ার ফিট আয়তনের ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ২ হাজার স্কয়ার ফিট আয়তনের প্রতিটি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা।

হাসপাতালের সামনে বর্জ্য নিয়ে গত ২৬ আগস্ট ‘হাসপাতালের চেয়ে ডাস্টবিন বড়, তারচেয়ে বিলবোর্ড’ শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউনে একটি সংবাদ প্রকাশ হলে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

গত  বুধবার (০৯ ডিসেম্বর) রাজধানীর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও মসজিদসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সামনে বা আশেপাশ থেকে ডাস্টবিন সরানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মহিদুল কবির ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই মেয়র এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ দুই সচিব ও পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালককে (ডিজি)কে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন। বিশেষত মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডের এই মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে ময়লার যে স্টেশন রয়েছে, সেটি ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে নিয়মানুযায়ী পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হবে বলেও জানান আইনজীবী মহিদুল কবির।

এ প্রসঙ্গে হাসপাতালটির ডেপুটি ডিরেক্টর ড. মুনীরুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই আমরা আবেদন করে আসছি যেন হাসপাতালের সামনে থেকে ময়লার স্তূপ সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সেটা না সরিয়ে উল্টো এখন স্থায়ীভাবে হাসপাতালের সামনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। মা ও শিশুর জন্য এটি রীতিমতো মারাত্মক হুমকি। যেসব মা নবজাতক শিশুদের নিয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে সেসব মা ও শিশুর জন্য ডাস্টবিনের ময়লা-আবর্জনা থেকে ছড়ানো জীবাণুর সাহায্যে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি থাকছে।

তবে হাসপাতালের সামনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র হলেও কোনও ক্ষতির কারণ হবে না বলে মনে করছেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মেসবাউল করিম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,প্রায় ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে খোলা জায়গায় ময়লা ফেলা হতো। সিটি করপোরেশনের ‍উদ্যোগে সেখানে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। ফলে এখন আর সমস্যা হবে না। ভালোভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নূন্যতম ২ হাজার স্কয়ার ফিট জায়গা লাগে। সেখানে ১৫শ স্কয়ার ফিট জায়গা হবে। প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ময়লার স্তূপ সরিয়ে নিতে আবেদন করেছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মেসবাউল করিম বলেন, হাসপাতাল আমাদের কাছে আবেদন করেছিল। কিন্তু স্থানীয় কাউন্সিলরের সঙ্গে পরামর্শ করে এ জায়গাটিতেই আবর্জনা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রটি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া আর কোথাও জায়গা খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

হাসপাতালের সামনে ময়লার স্তুপ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মা ও শিশুসহ রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেকোনও হাসপাতালের জন্য প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন নিরাপদ পরিবেশ। হাসপাতালের সামনে কোনও অবস্থায় ডাস্টবিন বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হওয়া ঠিক না। ময়লার মধ্যে থাকা যেকোনও জীবাণু বাতাসের সঙ্গে মিশে রোগীদের ক্ষতি করতে পারে। সন্তান প্রসবের পর মায়েদের ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নবজাতক শিশুও পরিপক্ক না হওয়া ইনফেকশনের ঝুঁকি থাকে।

এদিকে বর্জ্য ব্যস্থাপনার জন্য  ট্রান্সফার ষ্টেশন পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক ও স্থপতি ইকবাল হাবীব। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,বাংলাদেশেই কেবল এই পদ্ধতিতে অর্ন্তবর্তীকালীন শর্টিং করার ব্যবস্থা করা হয়,যার মাধ্যমে দূগর্ন্ধ হয়ে অন্যান্য দূষণ তৈরি হয়। দূর্ভাগ্যের বিষয় এটি কোনও পরীক্ষিত পদ্ধতি না।কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা এটার কোনও পাইলট প্রজেক্ট না করেই মেয়রকে ভুল বুঝিয়ে এই ট্রান্সফার ষ্টেশনের কাজ করছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রান্সফার ষ্টেশন করার আগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সার্বিক গণমানুষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত ছিল। কারণ ট্রান্সফার ষ্টেশন করলেই যাদুর মতো সব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হয়ে যাবে না।

ইকবাল হাবীব আরও বলেন,এ ধরনের কার্যকমের মাধ্যমে যে দূষণ তৈরি হবে সেটি  বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যতটুকু উপকার করবে তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করবে।সেই ক্ষতিকে পুষিয়ে নেওয়ার মতো কোনও পরিকল্পনা আছে কিনা সেটা আমাদের জানার অধিকার রয়েছে।

 

অন্যদিকে হাসপাতালের সামনে ডাম্পিং ষ্টেশন কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে মত দিয়েছেন  পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু নাসের খান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,ডাম্পিং করতে হলে সেখানে দুষণ ছড়াবেই।একটা হাসপাতাল যেখানে থাকবে সেখানে রোগ-জীবানু ছড়াতে পারে এমন কিছু থাকতে পারবে না। এটা ষ্পষ্ট পরিবেশ আইনের লঙ্ঘণ।তাহলে সিটি কর্পোরেশন নিজেই নিজের আইন ভাঙ্গছে। তীব্র নিন্দা জানাই সিটি কর্পোরেশনের এ সিদ্ধান্তে।  

 

/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম