তীব্র শীতেও ফ্যান চালাচ্ছেন জমিরুল ইসলাম খোকা (৫৫)। গায়ে শুধুই একটা পাতলা হাফ হাতা শার্ট। টানা ৮ ঘণ্টা চুলার পাড়ে কাজ করেন তিনি। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলছে এভাবেই। শুধু শীত নয়, বছরের পুরো সময়েই শীতের পিঠা বিক্রি করেন। পিঠা বেচেই সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। এখন আর অভাব নেই। কিন্তু পিঠা বেচা ছাড়েননি তিনি।
জানা যায়, ২৫ বছর আগে রিকশা চালিয়ে ঠিকমতো সংসার চালাতে পারছিলেন না তিনি। এরপর রিকশা ছেড়ে পিঠা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তেই বদলে যায় ভাগ্য। আর কখনও পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। পিঠা বিক্রি করেই বানিয়েছেন পাকা বাড়ি, কিনেছেন বিঘায় বিঘায় জমি; মালিক হয়েছেন শ্যালো মেশিন, পাওয়ার টিলার ও মোটরসাইকেলের। এছাড়াও পিঠা বিক্রির টাকা দিয়েই দুই মেয়ের বিয়ের খরচও দিয়েছেন, একমাত্র ছেলেকে বানিয়েছেন ইউনানী চিকিৎসক।
পিঠার পিঠে ভাগ্যকে বদলে ফেলা জমিরুল ইসলামের বাড়ি জেলার বোদা পৌরসভার মীরপাড়া গ্রামে। তার ডাক নাম খোকা হলেও স্থানীয়ভাবে অনেকেই তাকে চিতুয়া খোকা বলেই ডাকেন। বোদা পৌরসভা এলাকার ধানহাটি মাঠের দক্ষিণ দিকে তার টিনশেড দোকান। সেখানেই তিনি বিক্রি করে থাকেন শীতকালীন নানান প্রকারের পিঠা। তবে চিতুয়া বা চিতই, তেল পিঠা বা পোকন পিঠা এবং গুড়গুড়িয়া পিঠা বিক্রি করেন বেশি। দোকানে পিঠা খেতে খেতে কথা হয় খোকার সঙ্গে।
জমিরুল ইসলাম খোকা জানান, বিয়ের পর সংসারে টানাপড়েন শুরু হয়। রিকশা চালানো শুরু করি। তা দিয়ে কোনরকমে সংসার চলতো। একদিন হাটে পিঠা বিক্রি করতে দেখে এই পরিকল্পনা কথা মাথায় আসে। সেই ২৫ বছর আগে এই পিঠা বিক্রি শুরু করি। শুধু শীতকালে নয়, সারা বছরই পিঠা বিক্রি করে আসছি। দৈনিক ১৮ থেকে ২০ কেজি চালের চিতই পিঠা এবং ৩ কেজি চালের তেল পিঠা তৈরি করি। দৈনিক পাঁচশ’ থেকে সাতশ’ চিতই পিঠা এবং দুই থেকে তিনশ’ তেল পিঠা বিক্রি করি। প্রতিটি পিঠার দাম মাত্র পাঁচ টাকা।
তিনি জানান, দুপুরের পর দোকানে পিঠা বানানো শুরু হয়। চলে রাত ১০টা সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। পুরো সময়টা চুলার পাশে বসে থাকায় তার কোনও শীত লাগে না বরং তাকে ফ্যান চালাতে হয়। পিঠা তৈরির চাল, তেল, গুড়, সরিষা, লবণ, মরিচ, পেঁয়াজ, মসলাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রে প্রতিদিন খরচ হয় বারোশ’ থেকে পনেরোশ’ টাকা। সব খরচ বাদে দৈনিক আয় হয় আটশ’ থেকে এক হাজার টাকা।
পিঠা বেচে ভাগ্য বদলের ব্যাপারে তিনি জানান, পিঠা বিক্রির আয় দিয়েই সংসার চলে। ছেলে-মেয়েদের মানুষ করা, বিয়ে দেওয়া সবই এই টাকায়। বর্তমানের দোকানটিসহ চার কক্ষের একটি পাকা বাড়ি দিয়েছেন পিঠা বিক্রি করেই। এছাড়াও কিনেছেন জমি, কৃষি করার জন্য ক্রয় করেছেন শ্যালো মেশিন, পাওয়ার টিলার ও মোটরসাইকেল।
পিঠা বানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, একটি চুলার ৮টি মুখে তাওয়া বসানো রয়েছে। প্রতিটি তাওয়ায় এক সঙ্গে ৮পিঠা তৈরি করা হয়। পিঠা বিক্রির কাজে রশিদুল ইসলাম ও আছিরুল নামে আরও দুজন কাজ করেন। তাদের একজনকে দৈনিক দুইশ’ ও একজনকে দৈনিক একশ’ করে টাকা দেন।
বোদা উপজেলার একসময়ের নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় (গোলরক্ষক) আব্দুস সাত্তার জানান, ‘খোকার পিঠার স্বাদই অন্যরকম। পরোটা বা অন্য কিছু খেলে গ্যাস, পেটের পীড়াসহ নানা সমস্যা হচ্ছে। গরম গরম এই পিঠা খেতেও ভালো লাগে, কোন সমস্যাও হয় না।’
অ্যাডভোকেট খলিলুর রহমান জানান, এরা পিঠা বিক্রি না করলে হয় তো পিঠার স্বাদই নেওয়া হতো না। বিকালে বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে নাস্তা হিসেবে এখানে পিঠা খেতে আসা হয়।
বোদা পাথরাজ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. ফজলুল হক জানান, বর্তমানে আগের মত গ্রামে-গঞ্জে আর পিঠাপুলির আয়োজন চোখে পড়ে না। বাসা বাড়িতেও বানানো হয় না। তাই বিকালে বাজারে এলে এখানে পিঠা খাই। অল্প টাকায় নাস্তা হয়ে যায়।








