শ্রমিক সংকটের মধ্যেই হাওর অঞ্চলে ধান কাটা শুরু

উজ্জল চক্রবর্তী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৯ এপ্রিল ২০২০, ১৮:৪১আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ১৮:৪৯

শ্রমিক সংকটে অন্য পেশার শ্রমিকরা ধান কাটছেন চলতি মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে বরোধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু করনোভাইরাসের কারণে জেলা লকডাউন থাকায় চলতি বোরো মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে অন্যান্য জেলার শ্রমিকরা আসতো পারেননি। তাই ধানকাটা শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিক শূন্যতা পূরণে স্থানীয় চাষিরা এলাকার বেকার শ্রমজীবী মানুষদের কাজে লাগিয়ে উচ্চ মূল্য দিয়ে বাধ্য হয়ে জমি থেকে ধান কাটছেন। এতে ধানের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে বলে অভিমত কৃষকদের। তবে জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন ধান কাটার ক্ষেত্রে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. রবিউল হক মজুমদার জানান, চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে এক লাখ ১১ হাজার ৮শ’ ৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর মধ্যে এক লাখ ১০ হাজার ৮শ’ ৮৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৯৯ ভাগ সফল হয়েছে। একভাগ কম হওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘রবি মৌসুমে কিছু জমিতে সরিষা ভুট্টা ও সূর্যমুখীর চাষের কারণে এক ভাগ জমিতে বোরো আবাদ কমে গেছে। এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে জেলা লকডাউন করা হয়। যার কারণে এলাকার ভ্যানচালক, রিকশাচালক শ্রমিকেরা ধান কাটার দিকে এগিয়ে এসেছেন। এতে চাষিরা চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিক পাচ্ছেন। আমরা চাষিদের সঙ্গে কথা বলছি। তারা যদি বাইরে থেকে শ্রমিক আনার চিন্তা করেন আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সরকারি অনুমতি দিচ্ছি। সরকারি স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাইরে থেকে শ্রমিক আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বোরো মৌসুমে রংপুর থেকে ১২৩০ জন, গাইবান্ধা থেকে ৩০০ জন, কুড়িগ্রাম থেকে ৩০০ জন
জামালপুর থেকে ৫৭০ জন, ময়মনসিংহ থেকে ৬ হাজার ১৪০ জন, নেত্রকোনা থেকে ২ হাজার ১৭৫ জন, কিশোরগঞ্জ থেকে ৫ হাজার ৩৭৮ জন, হবিগঞ্জ থেকে ৬৫০ জন ও সুনামগঞ্জ থেকে ২২৫ জন শ্রমিকসহ জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ১৬ হাজার ৯৬৮ জন শ্রমিক এসে থাকেন। এ বছর জেলা লকডাউন ও করোনাভাইরাসের প্রভাবে কারণে স্থানীয় ও বহিরাগত শ্রমিক মিলিয়ে মাত্র দেড় হাজার শ্রমিক ধান কাটার কাজ করছেন। পাশাপাশি ৪০টি ধান কাটার আধুনিক যন্ত্রের (হারভেস্টার) মাধ্যমে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে কৃষক তার ধান গোলায় তুলতে পারবে।

চৈত্রের কাঠফাটা রোদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধরন্তির হাওরে বিবর্ণ হয়ে ধান কাটছিলেন সরাইলের শ্রমিক হাসান। আগে থেকে ধান কাটার অভ্যাস না থাকায় কিছুটা অস্বস্তিতে ধানে কাচি চালাচ্ছিলেন তিনি। হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তিনি রাজধানীর একটি খাবার হোটেলে বাবুর্চির কাজ করতেন। করোনাভাইরাসের প্রভাবে হোটেল বন্ধ হওয়ায় গত একমাস ধরে তিনি নিজ এলাকা সরাইলে অবস্থান করছিলেন। কর্মহীন থাকায় সংসার চলছে না। কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। এরই মধ্যে এলাকায় বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। বাইরের জেলা থেকে এ বছর শ্রমিকরা আসতে না পারার কারণে ধানকাটা শ্রমিকের সংকট দেখা দেয়। অভিজ্ঞতা না থাকলেও হাসান ছোটবেলায় ধানকাটা দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তবে কখনও ধান কাটেননি। অভাবের সংসারে বেকার বসে থাকা তার জন্যে অনেকটাই পীড়াদায়ক। তাই পিছপা না হয়ে প্রতিবেশী কৃষকের জমিতে ধান কাটার কাজে যোগ দেন। ধান কাটার ফাঁকে হাসান বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমাদের এখন কোনও কাজ নেই। ধান কেটে যা টাকা পাই তা দিয়েই পরিবারকে নিয়ে চলতে হবে। কারও কাছে হাত পাতার অভ্যাস নেই। পরিশ্রম করে যা পাই তাই দিয়ে সংসার চলে। ’ এ সময় তিনি প্রার্থনা করেন, আল্লাহ যেন এই পরিস্থিতি থেকে তাদের দ্রুত মুক্তি দেন।

হাসানদের মতো ধান কাটার কাজে অংশ নিয়েছে জয়ধরকান্দি গ্রামের স্কুল শিক্ষার্থী মামুন। ধান কাটার ফাঁকে শিক্ষার্থী মামুন জানায়, সে জয়ধর কান্দি আলিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। করোনা ভাইরাসের কারণে পরিবারে দুর্দিন নেমে আসায় বাবার সঙ্গে হাওরে বোরো ধান কাটছে।

হাওরে ধানের বোঝা নিয়ে মেঠো পথে চলার সময় কথা হয় চট্টগ্রামে ফেরি করে স্টিলের পণ্য বিক্রেতা মো. মহরম ভূঁইয়ার সঙ্গে। চৈত্রের তাপদাহে তার
পরনের শার্টটি ভিজে ঘাম ঝরছে। তিনি বলেন, ‘ভাই আগে ধান কাটিনি। পরিস্থিতির শিকার হয়ে ধান কাটা এবং ধান বহনের কাজে নেমেছি। একটা কিছু করে চলতে তো হবে। আল্লাহ আমাদের রহম করুন।’

নাসিরনগরের দাতমন্ডল এলাকার জেলে প্রাণতোষ দাস বলেন, ‘হাওরে পানি আসেনি। এ কারণে মাছ ধরা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ধান কেটে অভাব মোচন করছি।’
স্বল্পসংখ্যক শ্রমিক দিয়েই চলছে বোরো মৌসুমের ধান কাটা  এদিকে জমির মালিক কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ থেকে আমাদের ধরন্তির হাওরে ধান কাটার শ্রমিকরা আসতেন। এ বছর আমরা তাদের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও এ বছর করোনা ভাইরাসের কারণে তারা আসতে পারেননি। তাই বাধ্য হয়েই এলাকার বেকার লোকদের নিয়ে জমিতে ধান কাটার কাজ করছি। এতে করে আমাদের ধানকাটার ব্যয় বাড়বে।’

এক প্রশ্নের জবাবে কৃষক শফিক জানান, বাইরের ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি কম। এলাকার মানুষের মজুরি বেশি তাই ধানের উৎপাদন খরচের পাল্লা ভারি হবে। এলাকায় শ্রমিক না পেলে এসব ধান শিলাবৃষ্টি আর ঝড়-তুফানে জমিতেই নষ্ট হতো। এ বছর যদি ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া যায় তাহলে লোকসান হবে।

জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান বলেন, ‘আগে যেমন বাইরে থেকে শ্রমিক এসে জমিতে কাজ করতেন, এ বছরও তারা কাজ করবেন। হয়তো সংখ্যায় কিছুটা কম হবে। আমরা সব প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি সমস্যা সমাধান করতে পারবো।’

/এমএএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম