এক মণ টমেটো বিক্রি করে তিন কেজি চালও কিনতে পারছেন না চাষিরা। দুই-তিন টাকা কেজি দরেও টমেটো বিক্রি করতে পারছেন না তারা। এজন্য টকটকে লাল টমেটো গাছেই নষ্ট হচ্ছে। করোনার প্রভাবে দাম না পেয়ে উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না বরং পুঁজিও শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে এই টমেটো চাষ করেছেন। তারা ঋণের টাকা এখন কীভাবে শোধ করবেন তাই ভেবে পাচ্ছেন না।
পঞ্চগড় জেলার পাঁচ উপজেলাতেই টমেটো চাষ করা হয়। এবছর দুই হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে টমেটো বা হাইব্রিড চাষ হয়েছে। অন্য সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে এখান থেকে শত শত ট্রাকে ভরে টমেটো নিয়ে যেতেন। কিন্তু লকডাউনের কারণে এবার বাইরের ব্যবসায়ীরা আসতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকরা জানিয়েছে, কয়েক হাজার টমেটোর আড়তে পঞ্চগড়ে কয়েকশ' কোটি টাকা লেনদেন হতো। অথচ বর্তমানে পঞ্চগড়ের টমেটোর আড়তগুলো খালি পড়ে আছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করতে সবমিলিয়ে খরচ পড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এই পরিমাণ জমিতে টমেটো হয় প্রায় দুইশ' মণ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবার প্রতিমণ টমেটো বিক্রি হতো পাঁচ থেকে ছয়শ' টাকা। এতে অনায়াসেই লাভ হতো। করোনাভাইরাসের কারণেই এবার কৃষকদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের গোফাপাড়া গ্রামের তরিকুল্লাহ মুন্সি জানান, এক বিঘা জমিতে টমেটো চাষে খরচ হয় ২০-২৫ হাজার টাকা। এবার প্রতি মণ বিক্রি করছি ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা। গত বছর চার-পাঁচশ’ টাকা মণ দরে টমেটো বিক্রি করেছি। করোনায় আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে।
জেলার পানিমাছপুকুরী এলাকার খলিলুর রহমান নামের একজন স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবসায়ী জানান, আমাদের তো নিজেদের টাকা নেই। বাইরের ব্যবসায়ীরা এসে টাকা দিতো। আমরা টমেটো কিনতাম। কিন্ত লকডাউনের কারণে এবার বাইরে থেকে কোনও ব্যবসায়ী আসেননি। আমরা স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী কম করে কৃষকদের কাছ থেকে টমেটো কেনা শুরু করেছি। কিছু পাঠিয়েছি। এখনও টাকা পাইনি।
জেলার কাঁচামাল ব্যবসায়ী বাবুল হোসেন ও আম-কাঠাল এলাকার রহমত আলী জানান, গতবছর ছয় চাকার ট্রাক ৩০-৩৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়েছি। কিন্তু এবার ৫০-৬০ হাজার টাকা ভাড়া। কোনও কোনও ট্রাকে সামান্য লাভ হয়েছে আবার কোনও কোনও ট্রাকে লোকসান হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে টমেটো কিনবো কীভাবে।
তারা আরও জানান, আপাতত ভাল মানের টমেটো কিনছি ১২০-১৬০ টাকা মণ দরে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এলে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।
পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবু হানিফ জানান, অন্যান্য জেলার চেয়ে পঞ্চগড়ে শীতকাল বেশ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় কৃষকরা কয়েক বছর ধরে নাবী জাতের শীতকালীন টমেটো চাষ করে আসছে। অধিক লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা রবি মৌসুমে টমেটো আবাদে ঝুঁকে পড়ে। করোনা ভাইরাসের কারণে লকডাউনের কারণে বাইরের ব্যবসায়ীরা আসতে পারছেন না। একারণে এবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পঞ্চগড়ের টমেটো চাষিরা।
এদিকে পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী জানান, কৃষকের উৎপাদিত টমেটোসহ বিভিন্ন ফল ও ফসল এবং সবজির নায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পুলিশ সহায়তা করছে। এজন্য ব্যবসায়ী ও কৃষককে পুলিশের সঙ্গে যোগযোগ করতে বলা যাচ্ছে।








